Thursday, 13 October 2016

লা মাযহাবী বন্ধুরা দয়া করে জবাব দিবেন কি?


জামা‘আতের সাথে নামায আদায় করা ওয়াজিব

জামা‘আতের সাথে নামায আদায় করার ব্যাপারে শরী‘আতে যখেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
(ক) কুরআনে কারীমে মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। অর্থাৎ, মসজিদে জামা‘আতের সাথে নামায আদায় কর। (সূরা বাকারা, ৪৩, তাফসীরে ইবনে কাসীর ১ম খন্ড ৮৮ পৃষ্ঠা, তাফসীরে মাজহারী-১/৬৩)
জামা‘আতের গুরুত্ব সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস
(খ) হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঐ স্বত্তার কসম যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ, আমার মনে চায় যে লোকদেরকে প্রথমে কাষ্ঠ সংগ্রহের নির্দেশ দেই, অতঃপর একজনকে জামা‘আত কায়িম করার হুকুম দেই এরপর ঐ সকল পুরুষদের কাছে যাই যারা জামা‘আতে হাজির হয়নি এবং তাদের ঘর-বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেই। (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৬৪৪)
(গ) হযরত আবু হুরাইয়া (রাযি.)-এর সূত্রে বর্ণিত, এক অন্ধ ব্যক্তি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার এমন কোন সাহায্যকারী নেই যে আমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে। এই বলে তিনি রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ঘরে নামায পড়ার অনুমতি চাইলেন । প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু পরক্ষণই তাঁর চলে যাওয়ার মুহূর্তে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে জিজ্ঞাস করলেন, তুমি কি আযান শোন? তিনি জওয়াব দিলেন হ্যাঁ। আযান শুনতে পাই। তখন রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, তাহলে তুমি মসজিদে এসে জামা‘আতের সাথে নামায আদায় করবে। (মুসলিম শরীফ হাদীস নং-৬৫৩)
উল্লেখ্য যে, অন্ধ ব্যক্তির জন্য জামা‘আতে উপস্থিত হওয়া জরুরী না থাকা সত্ত্বেও জামা‘আতের গুরুত্ব বুঝনোর জন্য এবং বিশিষ্ট সাহাবী হওয়ার কারণে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে জামা‘আতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
(ঘ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলেন, আমাদের যুগে আমি দেখেছি যে, প্রকাশ্য মুনাফিক এবং অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জামা‘আত ত্যাগ করত না। এমনকি কোন অসুস্থ ব্যক্তি যদি দুই জনের কাঁধে ভর করে হাটতে পারত তবে সেও মসজিদে এসে জামা‘আতে শরীক হত। (মুসলিম শরীফ হাদীস নং-৬৫৪)
জামা‘আতে নামায পড়ার ফযীলত
(১) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত- নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, জামা‘আতের সাথে আদায়কৃত নামায একাকী নামাযের চেয়ে ২৭ গুন বেশী ফযীলতপূর্ণ। (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৬৪৫)
(২) হযরত উসমান ইবনে আফ্‌ফান (রাযি.)-এর সূত্রে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ইশার নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করল সে যেন অর্ধরাত দাঁড়িয়ে ইবাদত করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারারাত নামায পড়ল। (মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৬৫৬)
(৩) হযরত আনাস (রাযি.)-এর সূত্রে অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য লাগাতার ৪০ দিন ক্রমাগত তাকবীরে উলার সাথে জামা‘আতে নামায আদায় করবে , তার জন্য দুটি সনদ লিখে দেয়া হবে, ১টি হল তার জাহান্নাম থেকে মুক্তির। অপরটি হল মুনাফেকীর ফিরিস্তি থেকে মুক্তির। (তিরমিযী শরীফ হাদীস নং-২৪১)
(৪) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাযি.) থেকে বর্ণিত- অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে যতদূরে অবস্থান করে, সে দূর থেকে মসজিদে আসার দরুণ ততবেশী সওয়ারে অধিকারী হবে। (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৬৫১, মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৬৬২)
(৫) হযরত আবু উমামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত- অন্য এক হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঘর থেকে উযু করে ফরয নামাযের উদ্দেশ্যে মসজিদ পানে রওনা হল, সে ইহরাম বেঁধে গমনকারীর প্রাপ্তসওয়াবের পরিমাণ সওয়াবের অধিকারী হবে। (আবূ দাউদ শরীফ হাদিস নং ৫৫৮)
জামা‘আতের সাথে নামায আদাযের কিছু উপকারিতা
(১) দীনী মাসাইল ইত্যাদি সম্পর্কে অনবগত লোকেরা উলামায়ে কিরাম থেকে দীন শিক্ষা করতে পারে।
(২) মুসলমানদের মধ্যে পরস্পরে ভ্রাতৃত্ববোধ ও আন্তরিকতার সৃষ্টি হয়।
(৩) ধনী ব্যক্তিরা অভাবীদের অবস্থা ও প্রয়োজনাদি সম্পর্কে সহজে অবগতি লাভ করেত পারে।
(৪) মুসলমানদের মধ্যে সাম্য ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
(৫) বিধর্মীদের উপর মুসলমানদের প্রভাব সৃষ্টি হয় ইত্যাদি।
(আলবাহরুর রায়েক ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬০৬।) ফতওয়ায়ে শামী-১/৫৫১, মারাকিল ফালাহ-১৫৬)
জামাত ত্যাগকারীদের ব্যাপারে হুযূর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সতর্ক বাণী
১। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলেন, যে ব্যক্তিকে এ কথা আনন্দ দান করে যে কাল কিয়ামতের দিন সে মুসলমান হিসেবে আল্লাহ তা‘আলার সহিত মিলিত হবে সে যেন ফরয নামায সমূহকে এমন স্থানে আদায়ের ইহতিমাম করে যেখানে আযান দেয়া হয় অর্থাৎ, মসজিদে,কেননা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নবীর জন্য এমন সুন্নাতসমূহ জারী করেছেন, যা হিদায়াতপূর্ণ। আর জামা‘আতের সাথে নামায আদায় নিশ্চিতরুপে সুনানে হুদা তথা হিদায়াতের আলোদানকারী সুন্নাতসমূহের অন্তর্ভূক্ত। যদি তোমরা ঐ সকল লোকদের অর্থাৎ, মুনাফিকদের ন্যায় গৃহাভ্যন্তরে নামায পড়তে আরম্ভ কর তাহলে তোমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে ছেড়ে দিলে। আর যদি তোমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে ছেড়ে দাও তাহলে নিশ্চিতভাবে তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। (মুসলিম শরীফ হাদীস নং-৬৫৪)
২. হযরত আবু দারদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত- প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, যে গ্রামে বা মাঠে তিনজন লোক থাকে অথচ তারা সেখানে জামা‘আতের সাথে নাময আদায় করে না, শয়তান তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে, সুতরাং তোমরা জামা‘আতকে জরুরী মনে কর, কেননা দলত্যাগী বকরীকে বাঘে খেয়ে ফেলে। (আবু দাউদ শরীফ হাদীস নং-৫৪৭, মুস্তাদরাকে হাকেম হাদীস নং-৯০০, মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং-২৭৫৮২)
৩. হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আযান শুনল অত:পর কোন শরয়ী উযর না থাকা সত্ত্বেও মসজিদে আসল না, তার নামায কবূল হবে না। সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) জিজ্ঞাসা করলেন উযর কি? রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন অসুস্থতা বা ভয়ভীতি। (আবু দাউদ শরীফ হাদীস নং-৫৫১, মুস্তাদরাকে হাকেম হাদীস নং-৮৯৬, ইবনে মাজা হাদীস নং-৭৯৩)
৪. হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত- প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন: হয়তো লোকেরা জামা‘আত তরক করা থেকে বিরত হোক, না হয় তাদের ঘর-বাড়ীগুলো জ্বালিয়ে দিব। (ইবনে মাজা হাদীস নং-৭৯৫)
পর্যালোচনা
উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসসমূহের আলোতে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাহ.) জামা‘আতের সাথে নামায আদায় করা ফরযে আইন বলেছেন, এবংইমাম শাফেয়ী (রাহ.) ফরযে কেফায়া বলেছেন। আর ইমাম আযম আবূ হানিফা (রাহ.) সক্ষম পুরুষদের জন্য জামা‘আতকে ওয়াজিব বলেছেন। হানাফী মাযহাবের কোন কোন কিতাবে জামা‘আতকে সুন্নাতে মুআক্‌কাদাহ বলা হলেও বিশুদ্ধ ও মজবুত মতানুযায়ী তার অর্থ হল মজবুত এবং শক্তিশালী হাদীস ও সুন্নাতের মাধ্যমে জামা‘আতে শরীক হওয়া ওয়াজিব প্রমাণিত। (আলবাহরুর রায়েক-১/৬০২, আল ফিকহুল ইসলামী-২/১১৬৭, শামী-১/৫৫২, বাদায়ে-১/১৫৫, ফাতহুল কাদীর-১/৩০০, মাহমুদিয়া-৭/১৩১, আলমগীরী-১/৫৩, রহীমিয়া-১/২১৩)
সুতরাং জামা‘আতের সাথে নামায আদায় করার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব প্রদান করা জরুরী। বর্তমানে অধিকাংশ লোকেরা জামা‘আতের ব্যাপারে যে অলসতা করছে এবং ঘরে বা দোকানে অফিসে একাকী নামায পড়ে নিচ্ছে তা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা। আর নামায তরক করাতো কুফরী কাজ, যা কোন মুসলমানের জন্যই শোভা পায় না। আল্লাহ তাআলা সকল মুসলমানকে নামাযী হওয়ার এবং সক্ষম পুরুষদেরকে জামা‘আতের সাথে নামায পড়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
যে সমস্ত উযরের কারণে জামা‘আত তরক করা জায়েয
(১) প্রবল বৃষ্টি (২) অতিরিক্ত ঠান্ডা (৩) হিংস্র জন্তু বা ডাকাতের ভয়-ভীতি (৪) ঘুটঘুটে অন্ধকার (৫) বন্দীত্ব (৬) অন্ধত্ব (৭) পঙ্গুত্ব (৮) হাত পা না থাকা (৯) ভীষণ অসুস্থ্যতা (১০) চলতে অক্ষম হওয়া (১১) রাস্তা কাদাযুক্ত হওয়া (১২) খোড়া হওয়া (১৩) অতিরিক্ত বার্ধক্য (১৪) ফিকহ শাস্ত্রের পাঠ্য আলোচনায় লিপ্ত থাকা (১৫) অতিরিক্ত ক্ষুধার সময় খাদ্য উপস্থিত থাকলে (১৬) সফরের ইচ্ছা করা ও তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া (১৭) রোগীর শুশ্রুষা করা (১৮) প্রচন্ড বাতাস প্রবাহিত হওয়া। (নূরুল ঈজাহ-৭৯, তাহতাবী-১৬২/১৬৩, তোহফায়ে আবরার-৭৭)

Sunday, 6 December 2015

ইসলাম বনাম গনতন্ত্র

সহীহ ঈমান ও নেক আমলের মধ্যেই মানুষের শান্তি ও কল্যাণ নিহিত। আর বিরুদ্ধাচরণের পরিণতিতে বেইজ্জতি, ধ্বংস ও জাহান্নাম অনিবার্য। আমলের চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, শুধু সহীহ ঈমান দ্বারাও জান্নাত লাভ হবে (যদিও তা প্রথম অবস্থায় না হোক), কিন্তু সহীহ ঈমান ব্যতীত হাজারো আমল একেবারেই মূল্যহীন। যথার্থ ঈমান ব্যতীত শুধু আমল দ্বারা নাজাত পাওয়ার কোন সুরত নেই। আমরা যদি দুনিয়াতে থেকে আমাদের ঈমানকে নষ্ট করে যাই তাহলে কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। কোন পীর-আউলিয়াতো দূরের কথা কোন নবী-পয়গম্বরও পারবে না। কবরে ঈমানী পরিক্ষা হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে চরম ফিতনার যুগে অনেক মানুষ সকালে মু‘মিন থাকলেও বিকালে ঈমানহারা হচ্ছে, আবার কেউ বিকালে মু‘মিন থাকলেও সকালে নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু মানুষের ঈমান-আকীদা সংরক্ষণের জন্য যথার্থ ব্যবস্থা সমাজে নেই। ইল্লা মাশাআল্লাহ। আবার দেখা যায় একই লোক যে নিজের ঈমানের জন্য জান মাল খরচ করছে সেই ব্যাক্তিই না জানার কারনে ঈমান ধংস করার জন্য জান মাল খরচ করছে । এমনই একটা বিষয় হলো গনতন্ত্র নামক ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করা।

বাদশা আকবর একটা ধর্ম বানিয়েছিল, দীনি ইলাহী। সে চাচ্ছিল ঐ ধর্ম দিয়ে হিন্দু-মুসলমানকে এক করা হবে। কিন্তু বাস্তবে মুসলমানকে হিন্দু বানানো হয়েছে। সে নিজেও বেইমান হয়েছিল। মূর্তি পূজা করতো। অথচ এক যমানায় সে তাহাজ্জুদ পরতো। আরেক যমানায় মূর্তি পূজক হয়ে গিয়েছিল। কাফের হয়ে মারা গেছে। গনতন্ত্রের কর্ণধাররা দেখলো ধর্ম নাম দেয়ার কারনে বাদশা আকবরেরটা চলে নি। গনতন্ত্র নামক ধর্ম, যা চালাকী করে তারা ধর্ম নাম দেয় নি। দিলেইতো মানুষ বুঝে ফেলতো আর এর মোকাবেলা করা শুরু করে দিত। মানুষকে বুঝতে দেয় নি। ডাক্তার যেমন রোগীকে তিক্ত স্বাদের ঔষধ এবং দূর্গন্ধ যুক্ত ঔষধ রোগীকে কেপসূলের মোরকে ভরে খাওয়ায় এবং রোগী একাই খেয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি তারাও গনতন্ত্র নামক ধর্মটা, ধর্ম নাম না দেয়াতে খুব সহজে সবাই মেনে নিচ্ছে । রোগীর নিজে কেপসূল খাওয়ার মত আমরাও নিজেরাই গনতন্ত্রের অনুসারি হচ্ছি। ধর্ম নাম দিলেই সবাই বুঝে ফেলতো। প্রশ্ন করতো সবাই, এটা আবার কোন ধর্ম। এই ধর্ম মানতে গেলে আমার ধর্ম থাকবে কিনা। কাজেই তারা এটাকে ধর্ম নাম না দিয়ে নাম দিল গনতন্ত্র বা Democracy.

ধর্মের সাথে গনতন্ত্র বা Democracy‘র সদৃশ বা মিলঃ

১.    ইসলামে কোন জরুরী কাজকে বলে ফরজ বা ওয়াজীব।                                                                                          ১.    গনতন্ত্রে কোন জরুরী কাজকে বলে Duty.

২.    ইসলামে কোন নিষিদ্ধ কাজকে বলে হারাম বা নাজায়েয।                                                                                         ২.    গনতন্ত্রে কোন নিষিদ্ধ কাজকে বলে আইন বিরোধী।

৩.    ইসলামে কোন ভালো কাজকে বলে হালাল বা জায়েয।                                                                                            ৩.    গনতন্ত্রে কোন ভালো কাজকে বলে আইন সম্মত।

৪.    ইসলামে মালিক বা খোদা হলো আল্লাহ।                  ৪.    এই Democracy ‘র খোদা একেক সময় একেক জন হয়। বর্তমান বিশ্বে আমেরিকার যে কর্ণধার হয় সে হয় Democracy ‘র খোদা।

৫.    ইসলামে অবতার বা নবী বা দূত হলো সর্বযুগের সর্ব শ্রেষ্ট মানব হযরত মুহাম্মাদ সাঃ.                     ৫.    অন্যান্য ধর্মের বাদশারা এই গনতন্ত্র নামক ধর্মের অবতার বা  Messenger বা দূত ।

৬.    ইসলামে আল্লাহর সৈনিক হলো ফেরেস্তা।                                                                                                          ৬.    গনতন্ত্রের ফেরেস্তা হলো সেনাবাহিনী, পুলিশ ।

৭.    ইসলামে নবীর উম্মত হলো মু‘মিন-মুসলমান।                                                         ৭.    গনতন্ত্রের উম্মত,ব্রিটিশ সিলেবাসের তালিমের দ্বারা স্কুল-কলেজগুলোতে প্রতিনিয়ত তৈরী হচ্ছে।

৮.  ইসলামে উপসানলয় বা ইবাদতের জায়গা হলো মসজিদ।                                              ৮.  গনতন্ত্রের উপসানলয়ের জায়গা হলো স্কুল কলেজ।

আইনের দিক দিয়ে কিছু মিলঃ

শরীয়ত যদি কেউ ছেড়ে দেয় তাহলে তাকে বলা হয় মুরতাদ। যার শাস্তি হলো কতল। ঠিক তেমনি গনতন্ত্র কেউ যদি ছেড়ে দেয় বা কোন দেশ যদি গনতন্ত্র ছেড়ে দেয় তাহলে তাকে ওরা, ঐ লোক বা দেশকে মুরতাদ মনে করে এবং একদম শেষ করে দেয়। শাস্তি একই কতল। যেমন কাশ্মিরে করা হচ্ছে সেনাবাহিনী দিয়ে। পাকিস্তানে করা হলো উত্তর প্রদেশে। পাকিস্তানের জামি‘আ হাফসা নামক একটা মহিলা মাদ্রাসায় করা হলো। তারাও গনতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা তুলেছিল। ঐখানে একটা মসজিদ আছে লাল মসজিদ। গুটি কয়েক মানুষ ছিল। এই কয়েকটা মানুষকে ঘেরাও করে রাখলেও হতো। কয়েক দিন পর না খেয়ে থাকতে না পেরে বের হয়ে আসতো । তা না করে সবাইকে গুলি করে মেরেছে। এই ছাত্রীগুলোকে আর মাদ্রাসার হুজুরদের গুলি করে মেরেছে। কারন তারা গনতন্ত্রকে অস্বিকার করায় ওদের নজরে মুরতাদ হয়ে গেছে। একে বলে গনতন্ত্রের মুরতাদ।

দুনিয়াতে যত পার্লামেন্ট আছে তারাও আইন বানায়। কিন্তু সেগুলো সব একদিক চিন্তা করে বানায়। এক সাইড দেখে আরেক সাইড দেখার কোন অবকাশ নেই। টেক্স বাড়াতে হবে বাড়াও, বিদ্যুত বিল বাড়াতে হবে তো বাড়াও। কেন বাড়াতে হবে, কি সমস্যা হয়েছে, কে বিদ্যুত চুরি করছে ? আমার লোক না অন্য লোক এই গুলো দেখার তারা কোন প্রয়োজন মনে করে না। জনগনের তৌফিকের মধ্যে আছে কি না এটা দেখার কোন প্রয়োজন তাদের নেই। বাড়ানোর কথা মনে হয়েছে তো বাড়াও। কিন্তু আল্লাহ এমন কোন আইন এমন কোন বিধান নাযিল করেন না। আল্লাহ সকল দিকে দেখেন। এই আইনের দ্বারা কারো কোন ক্ষতি হতে পারবে না। কোন পক্ষের না। সকলেই শান্তি পাবে। আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন আমাদের জন্য কী বিধান রেখেছেন তা জানতে হবে। যাতে করে আমাদের কাজটাও হয় আবার কারো কষ্ট না হয়, ক্ষতি না হয়, আমাদের কারনে কোন ভাইয়ের সমস্যা না হয়। এতো দিকে চিন্তা করে কোন মানুষের পক্ষে আইন বানানো সম্ভব না।

গনতন্ত্র কুফরী তন্ত্র, কেন ?:  এই গনতন্ত্র নামক ধর্মের দ্বারা অনেক ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ বদদ্বীন হয়ে যায়, কুরআনের আয়াতকে অস্বীকার করতে হয়। এটা কুফরী তন্ত্র। কুরআনের একটা আয়াতকে অস্বিকার করলে ঈমান থাকে না আর গনতন্ত্রেতো প্রচুর আয়াতকে অস্বিকার করা হয়েছে। নিম্নে ইসলামের সাথে গনতন্ত্রের যে বিরোধ তার দু‘একটা নমুনা দেয়া হলোঃ

গনতন্ত্র বা Democracy:

১.    বৈশিষ্টে বলা হয়েছে, “জনগন সকল ক্ষমতার উৎস”।

২.    গনতন্ত্র বলে আইন বানানোর অধিকার পার্লামেন্টের।

৩.    গনতন্ত্র বলে সার্বভৌমত্বের মালিক পার্লামেন্ট।

৪.    গনতন্ত্র বলে পার্লামেন্টের যে কোন আইন বানানোর অধিকার আছে এখানে চেলেঞ্জ করার অধিকার কারো নাই। তারা সর্বচ্চো ক্ষমতা রাখে।

৫.    গনতন্ত্র বলে অধিকাংশ লোকের মত-ই হবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

৬.    গনতন্ত্রে নেতা বা পরিচালক নির্বাচনের জন্য ঊষবপঃরড়হ করে।

৭.    গনতন্ত্রে নেতা বা পরিচালক হওয়ার জন্য মারামারি করে।

৮.  গনতন্ত্রে নেতা বা পরিচালক হতে লাখো, কোটি টাকা খরচ করে।

৯.    গনতন্ত্রে নেতা বা পরিচালক হতে হলে পেশী শক্তি, ইবলিসের মত বাটপারী বুঝ, চালাকী বুঝ, মাস্তান বাহিনী থাকতে হয়।

১০.  গনতন্ত্রে জোর করে ক্ষমতা নেয়।

ইসলাম:

১.    এই বৈশিষ্ট কুরআনের অনেক আয়াতের বিরুদ্ধে। কুরআনের এক আয়াতে বলা হচ্ছে “ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ ” অর্থাৎ সকল ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দেন, যার নিকট থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন। কোন পদে বসানোর মালিক আল্লাহ। আরেক আয়াতে বলা হচ্ছে “ َ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا ” অর্থাৎ সকল ক্ষমতার মালিক একমাত্র রব্বুল ‘আলামীন।

২.    কুরআন বলে “إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ” অর্থাৎ আইন বানানোর অধিকার একমাত্র আল্লাহর। পার্লামেন্টের দায়িত্ব শুধু আল্লাহর বানানো আইন খুঁজে খুঁজে প্রয়োজন অনুসারে জারি করা। আল্লাহর বানানো আইন বাস্তবায়ন করার পদ্ধতী বের করবে। আইন বানানোর অধিকার তাদের নেই। কোন নবী-রসূলও আইন তৈরী করতে পারে নাই। আইন বানানোর অধিকার একমাত্র আল্লাহর।

৩.    কুরআন বলে সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ। “ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ” অর্থাৎ আশমান জমিনের সব কিছুর মালিক রব্বুল ‘আলামীনের।

৪.    কুরআন বলে “ لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ ” অর্থাৎ আল্লাহ বলেন, আমি যা কিছু করবো কোন মাখলুকের কোন কিছু করার অধিকার নাই। কিন্তু তোমরা যা করবে তোমাদের জবাবদিহী করতে হবে। যেখানে আল্লাহ বলছেন,“ জবাবদিহী করতে হবে” সেখানে পার্লামেন্ট এমন আইন কিভাবে পাশ করাবে যেখানে জবাবদিহীতা থাকবে না !? যা মনে চাইবে তাই তারা আইন বানিয়ে নিবে চাই সেটা শরীআত বিরোধী হোক না কেন। যেমনঃ তারা সমকামীতাকে বৈধ মনে করেছে তো আইন বানিয়ে নিয়েছে। তাই সমকামীতার কারনে কাউকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। জনগন ও এটাকে বৈধ করার জন্য মিছিল করেছে। যা কুরআন বিরোধী। ঠিক এমন ভাবে ব্রিঠিশ পার্লামেন্ট শাশুরীকে বিবাহ করা বৈধ করেছে। তাদের ধারনা এটার প্রয়োজন আছে। অথচ শরীআতের হুকুম হলো স্ত্রী যদি মারা যায় বা তালাক প্রাপ্তাও হয় তবুও শাশুরীকে বিবাহ জায়েয নাই।

৫.    কুরআন বলে  “ وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّـهِ ۚ ” অর্থাৎ, অধিকাংশ লোকের মতের সাথে যদি একমত হও তাহলে তুমি গোমরাহ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জমানায় বেকুবের সংখ্যা বেশী রেখেছেন। আর জ্ঞানী গুণি,অভিজ্ঞ,দার্শনিক,বুদ্ধিমান,বিচক্ষন লোকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা অল্প কয়েকজন। এই জন্য ইসলামী নিয়মে অল্প কয়েকজন জ্ঞানী লোকদের পরামর্শে কোন জ্ঞানী বিচক্ষন ব্যক্তিকে নেতা বা দেশ পরিচালক বানানো হয়।

৬.    ইসলামে নেতা বা পরিচালক নির্বাচনের জন্য ঝবষবপঃরড়হ করা হয়।

৭.    ইসলামে নেতা বা পরিচালক হতে ভয় পায়।

৮.  ইসলামে নেতা বা পরিচালক হতে এক টাকাও খরচ করতে হয় না।

৯.    ইসলামে নেতা বা পরিচালক হতে হলে ঈমানদার, সৎ, আল্লাহওয়ালা, নেককার, পরহেজগার, আমানতদার, কুরআন-হাদীসের ব্যপারে সঠিক বুঝ আছে এমন হতে হয়।

১০.  ইসলামে যোগ্য ব্যক্তিকে জোর করে ক্ষমতা দেয়া হয়।

একটু চিন্তা করলেও বুঝা যায় যে, একজন প্রধান বিচারপতির মত বিজ্ঞ লোকের রায় আর তার বিপরীতে তিন হাজার কৃষক-মাঝির মত অজ্ঞ লোকের রায় কী এক হতে পারে ? কিন্তু গনতন্ত্রে  একজন প্রধান বিচারপতির রায় আর কৃষক-মাঝি/শ্রমিকের রায় এক ধরা হয়। গনতন্ত্র এমন পর্যায়ের অথর্ব যে এটা দিয়ে একটা প্রাইমারী স্কুল ও চলবে না। দেশতো দূরের কথা। যদি প্রায়মারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক নির্বাচন করার জন্য গনতন্ত্রের নিয়ম অনুসরন করে তাহলে ভাবার বিষয় একজন প্রধান শিক্ষকের যোগ্যতা কী কোন মূর্খ্য শ্রমিকের বুঝার কথা ? মূর্খ্য শ্রমিকের রায়ের দ্বারা প্রধান শিক্ষক নির্বাচন করতে চাইলে আরেকজন মূর্খ্য শ্রমিকই প্রধান শিক্ষক হবে। এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সাধারনতো দেশে প্রধান শিক্ষক নির্বাচন করা হয় কয়েকজন বিজ্ঞ/জ্ঞানী শিক্ষিত লোকের পরামর্শে। সেখানে গনতন্ত্র চলে না।

মূলতঃ কোন দেশই গনতন্ত্র দিয়ে চলে না। যারা এই গনতন্ত্র তৈরী করেছে তাদের দেশও গনতন্ত্র দিয়ে চলছে না। তাহলে কী দিয়ে চলে ? যে বেশী ইবলিসের মত বাটপারী বুঝে, চালাকী বুঝে, শক্তি বেশী, মাস্তান বাহিনী আছে, ওরা চালায়। তারা বলে, আমরা জনগনের রায় নিয়ে চলি। এটা একটা ধোকা। সম্পূর্ণ স্বৈরতন্ত্র। This is called democracy.

বিজ্ঞ-জ্ঞানী লোকেরা পরামর্শ করে প্রেসিডেন্ট থেকে নিয়ে চেয়ারম্যান পর্যন্ত সমস্ত পদে লোক নির্বাচন করলে তা সঠিক হবে। এবং এতে এক টাকাও খরচ হবে না, একটা লোকও খুন হবে না। কোন রকম পোষ্টার প্রচার মিসিলের দরকার হবে না। এই যে এত টাকা পোষ্টার, প্রচার, ক্যানভাস, মিছিলের পেছনে খরচ করে এর দ্বারা দেশের অর্থনৈতিক কী লাভ হয় ? কী লাভ হয় বানরের মত লাফালাফি করে, আর অমুুকের চরিত্র ফুলের মত পবিত্র বলে বেরালে? কাফের মুশরিকরা আমাদেরকে এই বেহুদা কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। আর আমরা নিজেকে পলিটিকাল ওয়ারকার ভেবে গর্ব করছি।

এমন গনতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত কাজে নিজেকে নিয়োগ করাও ঈমান ধংসের কারন। কেননা তখন রাষ্ট্রের কাজ সম্পন্ন করার জন্য তাকে এমন কাজ করতে যা শরী‘আত বিরোধী। নিম্নে কয়েকটি গুরত্বপূর্ণ পদের নমূনা দেয়া হলোঃ

সংসদ সদস্যঃ  কেউ যদি গনতন্ত্র মেনে সংসদ সদস্য হয় তাহলে তাকে এমন সব আইন বানাতে হবে যা কুরআনের বিরুদ্ধে। তখন ঈমানের কী হবে তার ?

বিচারপতিঃ কেউ যদি গনতন্ত্র মেনে বিচারপতি হয় তাহলে তাকে এমন ভাবে বিচার করতে হবে যা কুরআনের বিরুদ্ধে। কুরআনের বিচার অস্বিকার করতে হবে। যেমনঃ কুরআন বলেছে চোরের হাত কেটে দিতে হবে। বিবাহিত কেউ জিনা বা অপকর্ম করলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। পারবে কেউ তা মানতে ? তখন অস্বিকার করবে। তখন ঈমানের কী হবে তার ?

সেনাবাহিনী বা পুলিশঃ কেউ যদি গনতন্ত্র মেনে সেনাবাহিনী বা পুলিশ হয় তাহলে তাকে এমন সব কাজ করতে হবে যা কুরআনের বিরুদ্ধে। যেমনঃ নাস্তিকরা মিলে আল্লাহর বা আল্লাহর রসূল সাঃ বা ইসলামের বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য করলো। আর কয়েকজন খাঁটি আল্লাহর অলি এই নাস্তিকদের বিচারের দাবিতে এক হয়ে মিছিলে বের হলো। আপনাকে তখন যদি বলা হয়, এই হুজুরদের উপরে টিয়ার গ্যাস মারো, লাঠি পেটা করো বা গুলি করো। আর ঐ আদেশ যদি মানা হয় তখন ঈমানের কী হবে তার ? আল্লাহ যখন হাশরের ময়দানে বলবে “তুই আমার বন্ধুর উপরে গুলি করেছিস কেন ? অথচ তুুই নিজেও মুসলমান দাবি করছিস?” তখন যদি বলা হয় যে আমার উপরের স্যার আমাকে হুকুম করেছে। তাহলে সে আল্লাহর পাকরাও থেকে মুক্তি পাবে না। আল্লাহর রসূল সাঃ বলেছেন “লা তইয়াতিল মাখলুকিন .. .. .. .. .. ” অর্থাৎ, আল্লাহর নাফরমানী করে কোন বড়কে অনুসরন করা জায়েয নাই, হারাম।



বর্তমানে আমাদের করণীয়ঃ গনতন্ত্রেরতো আপাদমস্তক ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। ব্রিটিশরা গনতন্ত্রকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে। ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়েছে গনতান্ত্রিক নিয়মে। ঐ যে চাপিয়েছে আমরা এখন আর চাইলেও আমাদের থেকে এই গনতন্ত্রকে সরাতে পারছি না। অনেকেই আমরা না বুঝে এই ইংরেজী শিখতে গিয়ে গনতন্ত্রকে মনে প্রানে মেনে নিয়েছি। যারা রাজনীতি করছে তারাতো গনতন্ত্রকে মানে বলেই করে। তাদের প্রথম কাজ হবে এই গনতন্ত্রকে. সমাজতন্ত্রকে, বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ, বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ এই সবগুলোকে কুফরী মনে করতে হবে। মনে করতে হবে এইগুলো কাফেরদের তৈরী একটা ধর্ম, বাদশা আকবরের “দীনি ইলাহীর” মত একটা ধর্ম।

আমাদের দূ‘আ করতে হবে, মানুষকে বুঝাতে হবে। এই দুই কাজ চালু রাখলে এক সময় আমাদের থেকে গনতন্ত্রকে সরানো সম্ভব ইনশাআল্লাহ। আর তখন দেশে সব কিছু চলবে জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞ লোকের পরামর্শের দ্বারা। যেমনঃ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত হয় তখন তা জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞ লোকের পরামর্শের দ্বারা হয়। আশ্চর্য হলেও সত্য, ইসলামের এই একটা বিধান সামান্য একটু অনুসরন করার কারনেও আমরা ঐ দু‘তিন মাস কত শান্তি অনুভব করি।

ভোট কোন ফরজ বা ওয়াজীব না। ভোটের সময় ভালো মানুষকে দেশের সেবা করার সুযোগ করে দেয়ার লক্ষে ভোট দেয়া। দু‘চার জন ভালো লোককে সহী কথা বলার জন্য পার্লামেন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। যতদিন দেশে গনতন্ত্র থাকবে ততদিন এই হেকমতের কারনে ভোট দেয়া জায়েয।



শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।

Sunday, 1 November 2015

দারুল উলুম দেওবন্দের সিলসিলা

মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী (রহঃ) এর কালজয়ী ভাষণ অবলম্বনে 

কেউ বলতে পারেন, দেওবন্দ মাদ্রাসা তো প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে মাত্র কিছু দিন পূর্বে। আর জাতি হিসেবে মুসলমানরা তো বহু আগে থেকেই আছে। কিন্তু আমি পূর্বেই আপনাদের সামনে আলোচনা করেছি, দারুল উলুম দেওবন্দ কী উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছে আর মুসলিম জাতি তার কী কী ফলাফল ভোগ করেছে? মনে রাখতে হবে, মুসলিম জাতির কুষ্ঠিনামা বা বংশ পরম্পরার সূচনা মাদরাসা থেকে হয় না; বরং বংশ পরম্পরা শুরু হয় রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের সম্পর্ক কতখানি দৃঢ় এবং মজবুত।

আমরা গর্বের সাথে একথা বলতে পারি যে, আমাদের আধ্যাত্নিক সম্পর্ক যেভাবে রসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে, তেমনিভাবে ইলমের দিক থেকেও আমাদের সম্পর্ক রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত।

প্রথমে ইলমী সম্পর্কে কথা বলছি শুনুন, কিভাবে তা রসূলের সাথে সংযুক্ত।


ইলমে নববীর সনদ 


আমাদের পীর ও মুরশিদ হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহঃ) ইলমে দ্বীন হাসিল করেছেনঃ


১। শাহ আব্দুল গনী মুজাদ্দেদী (রহঃ) থেকে

২। শাহ আব্দুল গনী (রহঃ) শাহ ইসহাক (রহঃ) থেকে

৩। তিনি শাহ আব্দুল আযীয থেকে

৪। তিনি শাহ ওয়ালী উল্লাহ থেকে

৫। তিনি শায়খ আবু তাহের মাদানী থেকে

৬। তিনি (তদীয় পিতা) শায়খ ইব্রাহীম কারদারী থেকে

৭। তিনি শায়খ আহমদ কোশাশী থেকে

৮। তিনি শায়খ আবুল মাওয়াহিব আহমদ ইবনে আব্দুল কুদ্দুস শানাভী থেকে

৯। তিনি শাহ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে রমলী থেকে

১০। তিনি শায়খুল ইসলাম আবু ইয়াহইয়া আহমেদ যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মদ আনসারী থেকে

১১। তিনি শায়খ শিহাবুদ্দীন ইব্রাহীম ইবনে আহমদ তানুখী থেকে

১২। তিনি শায়খ সিরাজ উদ্দীন ইবনে মোবারক হাম্বলী যুবাইদী থেকে

১৩। তিনি আবুল ওয়াক্ত আব্দুল আউয়াল ঈসা ইবনে শোয়াইব সানজারী হারাবী থেকে

১৪। তিনি আবুল হাসান আব্দুর রহমান ইবনে মুজাফফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে দাউদ দাউদী থেকে

১৫। তিনি আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ সারাখসী থেকে

১৬। তিনি আবু মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ মাতার ইবনে সালেহ ইবনে বিশর আল ফেরারবী থেকে

১৭। তিনি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল থেকে

১৮। তিনি হযরত হাম্মাদ বিন যায়েদ থেকে

১৯। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক থেকে

২০। তিনি ইমাম আবু হানিফা থেকে

২১। তিনি আনাস ইবনে মালেক থেকে

২২। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে

২৩। তিনি রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে।



এই হলো আমাদের ইলমের সনদ।


এবার শুনুন কিভাবে রসূলের সাথে আমাদের আধ্যাত্নিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।



তাসাওউফ বা তরীকতের সনদ


কুতুবুল আলম হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহঃ) বেলায়েত শিখেছেনঃ


১। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী থেকে

২। তিনি মিয়াজী নুর মুহাম্মদ থেকে

৩। তিনি শাহ আব্দুর রহীম থেকে

৪। তিনি শাহ আব্দুল বারী থেকে

৫। তিনি শাহ আব্দুল হাদী থেকে

৬। তিনি শাহ আযদুদ্দীন থেকে

৭। তিনি শাহ মুহাম্মদ মক্কী আবু সাঈদ থেকে

৮। তিনি শায়খ নিজামুদ্দীন বলখী থেকে

৯। তিনি শায়খ জালালুদ্দীন থানেশ্বরী থেকে

১০। তিনি শাহ আব্দুল কুদ্দুস থেকে

১১। তিনি শায়খ মুহাম্মদ আরিফ থেকে

১২। তিনি শায়খ আরিফ ইবনে আহমদ থেকে

১৩। তিনি শায়খ আব্দুল হক রাদুলোভী থেকে

১৪। তিনি শায়খ জালালুদ্দীন থেকে

১৫। তিনি শায়খ শামসুদ্দীন থেকে

১৬। তিনি শায়খ আলাউদ্দিন সাবের কালারী থেকে

১৭। তিনি শায়খ ফরিদুদ্দীন গনজেশকর থেকে

১৮। তিনি খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী থেকে

১৯। তিনি খাজা উসমান থেকে

২০। তিনি খাজা হাজী শরীফ যিন্দানী থেকে

২১। তিনি খাজা হোযাইফা থেকে

২২। তিনি খাজা ইবরাহীম ইবনে আদহাম থেকে

২৩। তিনি ফুযাইল ইবনে আয়ায থেকে

২৪। তিনি খাজা আব্দুল ওয়াহিদ থেকে

২৫। তিনি হাসান বসরী থেকে

২৬। তিনি আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রঃ) থেকে

২৭। তিনি সাইয়েদুল মুরসালীন মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে। 

মাহবুবে খোদা রহমাতুললীল আলামীনের সাথে ইলমী ও রুহানী উভয় দিক থেকে আমাদের যোগসূত্র রয়েছে। এটাই আমাদের গর্ব।





মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী (রহঃ) এর কালজয়ী ভাষণ "ওলামায়ে দেওবন্দের সংগ্রামী ইতিহাস" অবলম্বনে

চেয়ারে বসে নামায আদায়-বিষয়ক দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া

চেয়ারে বসে Jameah_Darul_Uloom_Deoband_in24নামাজ :  জায়েজ না নাজায়েজ?
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মসজিদে চেয়ারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, সঙ্গে বেড়ে চলেছে চেয়ারে বসে নামাজ আদায়কারীর সংখ্যাও। হাঁটু, কোমর বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে সামান্য ব্যথা অনুভব করে ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিতে গেলে ডাক্তার বলে দেন- আপনি নামাজি ব্যক্তি হলে চেয়ারে বসে নামাজ পড়বেন। বেশি উঠবোস করলে ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পারে। বেচারা রোগী মানুষ, করবেও বা কী? এসব কারণে সামান্য ব্যথা হলেই এখন চেয়ারে বসে নামাজ পড়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এ কারণে প্রায় মসজিদে চেয়ারও সংযুক্ত হচ্ছে কল্পনাতীতভাবে। কাতারের মাঝখানে বা পাশে চেয়ার স্থাপন করার কারণে বিভিন্নভাবে মুসল্লিদের কাতারে যে মিলে দাঁড়ানোর কথা, তাতেও অনিয়ম দেখা দেয়। আবার কিছু লোক নিচে উপবিষ্ট, কিছু চেয়ারে, তাতেও কেমন যেন অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। যাতে মসজিদের যে পরিবেশ তাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। এ ধরনের আরো বহু কারণে মুসলমানরা উৎসুক হয়ে উঠেছেন চেয়ারে বসে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে শরিয়তের নীতি কী, তা জানতে।
এমনই একজন উৎসুক ব্যক্তি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগে এ ব্যাপারে একটি ফতোয়া চেয়েছেন। দারুল উলুম দেওবন্দের কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার পক্ষ থেকে কয়েক পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ লিখে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে, উত্তর দেন মুফতি যাইনুল ইসলাম কাসেমী। যা তাদের অনলাইন ফতোয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও বিষয়টি জানার দাবি রাখে, সে কারণে ওই ফতোয়াটি বাংলা ভাষা তুলে ধরেন মুফতি এনামুল হক কাসেমী
দাঁড়াতে ও সিজদা করতে সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য নামাজে কিয়াম বা দাঁড়ানো ফরজ এবং এটি নামাজের একটি রুকন। যদি দাঁড়ানো বা সিজদাদানে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ফরজ নামাজ বসে আদায় করা হয়, তবে নামাজের ফরজ বা রুকন ছেড়ে দেওয়ার কারণে নামাজ হবে না। নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। (দুররে মুখতার, যাকারিয়া বুক ডিপো ২/১৩২)
এমনকি যদি নামাজের কিছু অংশ দাঁড়াতে সক্ষম, পুরো সময় দাঁড়িয়ে থাকতে অপারগ, তবে যেটুকু সময় দাঁড়াতে পারবে তা কোনো লাঠি বা দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে হলেও সেটুকু দাঁড়ানো ফরজ। এমতাবস্থায় যদি না দাঁড়ায় এবং কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর পরিবর্তে বসেই নামাজ আদায় করে, তবে নামাজ হবে না। (দুররে মুখতার ২/২৬৭)
যদি কোনো লোক দাঁড়াতে সক্ষম, কিন্তু রুকু-সিজদা বা শুধু সিজদা করতে সক্ষম নয়, তার জন্য বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ। সে ইশারার মাধ্যমে রুকু-সিজদা করবে। এমতাবস্থায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার চেয়ে বসে ইশারার মাধ্যমে নামাজ আদায় করা উত্তম। (দুররে মুখতার ২/৫৬৭), ফতোয়া আলমগীরী ১/১৩৬-তেও এরূপ রয়েছে।
যেসব অক্ষমতার কারণে দাঁড়ানোর আবশ্যিকতা রহিত হয়ে যায়, তা দুই প্রকার :
১। হাকিকি বা মৌলিক : এমন অক্ষম, যে দাঁড়াতে পারবে না।
২। হুকমি বা বিধানগত : এমন অক্ষম নয় যে, দাঁড়ানো সম্ভব না, বরং দাঁড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অথবা এমন দুর্বলতা থাকে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অক্ষমতা বলে বিবেচিত, যেমন অসুস্থতা, যার ব্যাপারে অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তাররা পরামর্শ দেন যে দাঁড়ালে রোগ বৃদ্ধি পাবে অথবা সুস্থতা ফিরে আসতে বিলম্ব হবে কিংবা দাঁড়ানোর কারণে অসহনীয় ব্যথা অনুভূত হয়, এসব অবস্থায় বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ। (দুররে মুখতার মাআ রদ্দুল মুহতার ২/৫৬৫)
যদি অসহনীয় ও অস্বাভাবিক ব্যথা না হয়, বরং সামান্য ব্যথা অনুভব হয়, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে অক্ষমতা বলে বিবেচিত হবে না। এমতাবস্থায় বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ নেই। (তাতারখানিয়া-যাকারিয়া বুক ডিপো-২/৬৬৭)
যে লোক দাঁড়াতে অক্ষম, কিন্তু মাটিতে বসে সিজদার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে সক্ষম, তবে তাকে মাটিতে বসে সিজদাসহকারে নামাজ আদায় করতে হবে। মাটিতে সিজদা না করে চেয়ারের ওপর বসে বা মাটিতে বসে ইশারা করে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে না। (তাতারখানিয়া-যাকারিয়া বুক ডিপো-২/৬৬৭)
যদি রুকু ও সিজদা করতে অপারগ, কিন্তু মাটিতে বসে ইশারা করে নামাজ আদায় করতে সক্ষম, তবে তাশাহুদ অবস্থার মতো বসা আবশ্যক নয়। বরং যেকোনোভাবেই চাই মহিলাদের তাশাহুদে বসার মতো বা যে আসনে বসলে আরাম হয়, সেভাবেই মাটিতে বসে ইশারা করে নামাজ আদায় করবে। চেয়ারে বসা উচিত নয়। কারণ শরিয়ত এমন অপরাগদের মাটিতে বসার ব্যাপারে পূর্ণ ছাড় দিয়েছে, যে আসনে সম্ভব হয়, সেভাবেই বসে নামাজ আদায় করবে। (দুররে মুখতার মাআ শামী-২/৫৬৬)
এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছাড়া চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে কয়েকটি কারণে মাকরুহ হবে।
১. মাটিতে বসা সুন্নাত। এ পদ্ধতিতেই সাহাবায়ে কেরাম এবং পরবর্তী মুসলমানদের আমল চলে আসছে। ৯০ দশকের আগ পর্যন্ত চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করার প্রচলন ছিল না। খাইরুল কুরুন তথা ইসলামের সোনালি যুগেও এর কোনো নজির পাওয়া যায় না।
২. চেয়ার ব্যবহারের কারণে নামাজের কাতারে অনেক ফাঁকা রয়ে যায়। অথচ এত্তেসালে সফ তথা কাতারে পরস্পর মিলে দাঁড়ানোর ব্যাপারে হাদিসে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
৩. প্রয়োজন ছাড়া চেয়ার মসজিদে নেওয়ার কারণে বিধর্মীদের উপাসনালয়ের সাদৃশ্যতা দেখা দেয় অথচ দ্বীনি কাজে অন্যদের সাদৃশ্য গ্রহণ নিষেধ।
৪. নামাজ হলো বিনয় ও নম্রতার বহিঃপ্রকাশ, প্রয়োজন ছাড়া চেয়ার ব্যবহার করার চেয়ে মাটিতে নামাজ আদায় করলে বিনয় ও নম্রতা পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায়।
৫. মাটির নিকটবর্তী হওয়া নামাজের একটি কাম্য বিষয়, যা চেয়ারের ওপর আদায় করলে পাওয়া যায় না।
যদি কোনোভাবেই মাটিতে বসে নামাজ আদায় করার সাধ্য ও সামর্থ্য না থাকে, তবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করা যাবে। কিন্তু যদি যেকোনোভাবে মাটিতে বসে রুকু-সিজদা করার সামর্থ্য থাকে, তবে চেয়ারে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে না।
যে ক্ষেত্রে জরুরতের কারণে চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করার অনুমতি রয়েছে, সে ক্ষেত্রে সিজদার সময় ইশারার ওপরই ক্ষান্ত হওয়া উচিত। চেয়ারের কোনো অংশ যেমন কোনো কাঠের ওপর সিজদা করার তথা অক্ষম অবস্থায় কোনো উঁচু বস্তুর ওপর সিজদা করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। যেমন একদিন নবী করিম (সা.) কোনো সাহাবির শুশ্রূষা করতে তাশরিফ নিয়ে গেলেন। ওই সাহাবি অক্ষমতার কারণে একটি বালিশের ওপর সিজদা আদায় করছিলেন। নবী করিম (সা.) তাঁকে সেরূপ করা থেকে বারণ করতে গিয়ে বলেছেন, যদি মাটিতে সিজদা করা তোমার জন্য অসম্ভব হয়, তবে ইশারা করে নামাজ আদায় করবে এবং সিজদার মধ্যে রুকু অপেক্ষা সামান্য বেশি ঝুঁকবে। এ হাদিসটি মুসনাদে বাযযারে বর্ণিত। এর বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী। (এ’লাউস-সুনান- ৭/১৭৮)
আরেক বর্ণনায় আছে, উম্মুল মুমিনীন হজরত উম্মে সালমা (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর সামনে একটি বালিশ আনা হলো। এর ওপর তিনি সিজদা করতেন। নবী করিম (সা.) এটি দেখেছেন, কিন্তু নিষেধ করেননি। নবী করিম (সা.) কর্তৃক কোনো আমল দেখে চুপ থাকাটা অনুমতির প্রমাণ বহন করে।
আল্লামা শামী (রহ.) উভয় বর্ণনার মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বর্ণনা করেছেন, নামাজ আদায়কালে কোনো বস্তু উঠিয়ে তার ওপর সিজদা করা মাকরুহ। কিন্তু যদি মাটিতে আগে থেকে কোনো বস্তু স্থাপিত থাকে এবং নামাজ আদায়কারী এর ওপর সিজদা করে, তবে তা মাকরুহ হবে না।
ওই আলোচনার সার কথা হলো, কোনো পূর্ব স্থাপিত উঁচু বস্তুর ওপর সিজদা করা অথবা সিজদার জন্য কোনো বস্তু রাখা ছাড়া ইশারা করে নামাজ আদায় করা উভয়টিই জায়েজ। কিন্তু উল্লিখিত টেবিলসংযুক্ত চেয়ারে সিজদা করলে তাও মূল সিজদা হবে না, বরং ইশারার মতোই হবে। সুতরাং সেরূপ কুরসির ওপর বসে নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি যদি ইমামতি করে, তবে তার পেছনে রুকু-সিজদাকারী মুসল্লির নামাজ হবে না।
আল্লামা শামী (রহ.) লিখেন : কিন্তু নবী করিম (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম বারণ করার কারণে তা (উঁচু বস্তুতে সিজদা করা) অনুত্তম বলেই মনে হয়। তা ছাড়া যারা নিয়মিত চেয়ার বা কুরসিতে নামাজ আদায় করে থাকে, তাদের সব সময় নামাজে অসম্পূর্ণতা অনুভূত হবে। অর্থাৎ এরূপ সন্দেহ হবে যে আমরা তো সিজদাই করলাম না আমাদের নামাজ হচ্ছে কি না?
হজরত হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) একে অনুত্তম বলেন : সিজদা করার জন্য বালিশ বা কিছু উঁচু বস্তু রেখে দেওয়া এবং এর ওপর সিজদা করা উত্তম নয়। যখন সিজদা করতে অপারগ হবে, তখন ইশারা করেই নামাজ আদায় করবে। বালিশ বা উঁচু কিছুর ওপর সিজদা করার প্রয়োজন নেই। (বেহেশতী জেওর ২/৪৫, অসুস্থ ব্যক্তির নামাজের বর্ণনা)
উল্লিখিত দীর্ঘ আলোচনার সংক্ষিপ্ত নিম্নরূপ :
১. যে ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম নয়, কিন্তু যেকোনোরূপে মাটিতে বসে রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায় করতে পারে, তাকে মাটিতে বসেই রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায় করতে হবে। চেয়ার ইত্যাদিতে বসে ইশারায় রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে না। নামাজ আদায় হবে না।
২. যদি দাঁড়াতে পারে, কিন্তু কোমর বা হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়ার কারণে সিজদা করার শক্তি নেই অথবা ওই ব্যক্তি যে মাটিতে বসতে পারে কিন্তু রুকু-সিজদার শক্তি রাখে না, এরূপ লোক জমিতে বসে নামাজ আদায় করবে। চেয়ার ইত্যাদির ব্যবহার মাকরুহ হবে। হ্যাঁ, যদি কোনোভাবেই মাটিতে বসা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, তখন চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করা যেতে পারে। এমতাবস্থায় চেয়ার ব্যবহার করলেও সাদামাটা চেয়ার ব্যবহার করবে। টেবিলযুক্ত চেয়ার ব্যবহার করবে না।
মাটিতে বা চেয়ারে নামাজ আদায় করার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য :
১. চেয়ারে ইশারা করে নামাজ পড়ার সময় অনেকে রুকুতে হাত রানের ওপর রাখে এবং সিজদার সময় শূন্যে আলগে ধরে সিজদার ইশারা করে। এরূপ করা স্বীকৃত নয়। রুকু ও সিজদা উভয় ক্ষেত্রে হাত রানের ওপর রাখা উচিত।
২. অক্ষম অবস্থায় মাটিতে বসে রুকু-সিজদার সঙ্গে নামাজ আদায় করার ক্ষেত্রে রুকুতে নিতম্ব মাটি থেকে ওঠানোর প্রয়োজন নেই। বরং কপাল হাঁটু বরাবর হওয়া জরুরি। “বসা অবস্থায় রুকু করার সময় শুধু কপালকে হাঁটু বরাবর করা জরুরি। এর চেয়ে বেশি ঝোঁকার প্রয়োজন নেই। না নিতম্ব ওঠানোর প্রয়োজন আছে। (এমদাদুল আহকাম : ১/৬০৯)
চেয়ারে নামাজ আদায়কারীরা এখন নিজের অবস্থার ওপর চিন্তা করে দেখুন। বাস্তবে কি আপনি এমন অক্ষম যে, শরিয়তের দৃষ্টিতে আপনার জন্য চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে। বাস্তবে আপনি সেরূপ অক্ষম ও অপারগ না হলে চেয়ারে নামাজ আদায় পরিহার করতে হবে। যাতে আপনার নামাজ শরিয়ত অনুযায়ী হয়। মসজিদে প্রয়োজন ছাড়া চেয়ারের আধিক্য না হয়, মসজিদকে কোনো কনভেশন সেন্টার বা বিয়েবাড়ি বা হল মনে না হয়। আর একান্ত প্রয়োজনে যদি চেয়ার ব্যবহার করতেই হয়, তবে টেবিলযুক্ত চেয়ার যেন ব্যবহার না করা হয়।
সূত্র : মাসিক আল আবরার

ধর্ষণ কেন ? নেপথ্যে কী ?

ভয়ানকরূপে বৃদ্ধি পাচ্ছে ধর্ষণ। কোমলমতি শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের হাত থেকে। মানব সমাজের মরণব্যাধিরূপে আবির্ভূত ধর্ষণের স্টাইল ও কৌশলেও দিন দিন নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ভয়াবহতাও। ধর্ষণের পর গলা টিপে বা স্বাস রুদ্ধ করে হত্যা করা এখন অতি মামুলি ব্যাপার। চার থেকে পাঁচ বছরের যে শিশু, সেও অত্যন্ত নির্মমভাবে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ৩০-৪০ বছরের পাষ- লম্পট দ্বারা। আবার ১৩-১৪ বছরের ছেলে কর্তৃক ধর্ষিতা হচ্ছে ৬০ বছরের নারী। সমাজের নৈতিক দৈন্যতা যে কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁঁছেছে, তা বুঝার জন্য এরচে অতিরিক্ত কিছু উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে সারা দেশে মোট ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ৮১২ জন। এদের মধ্যে ৮৭ জনকে ধর্ষণ-পরবর্তী সময়ে হত্যা করা হয় এবং আত্মহত্যা করেন ১৪ জন। এ ছাড়াও ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে জুন পর্যন্ত ৩০৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সারা দেশে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ৯৮ জন এবং ২৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে সাতজন আত্মহত্যা করেছেন। আরও ৪৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
ধর্ষণের নেপথ্য কারণ কী এই প্রশ্নের জবাবে নারী পুরুষ একে অপরকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। পুরুষপক্ষ বলছে, নারীর উগ্র চলাফেরা, নগ্নতা, মিডিয়ায় তাদের কামনাময়ী হয়ে উপস্থাপন পুরুষকে ধর্ষণের দিকে উদ্বুদ্ধ করছে। নারী দিন দিন নারিত্ব সংকটে পড়ছে। নারী তার নারিত্ব বর্জন করে পুরুষের ভূমিকায় আবির্ভূত হতে চাচ্ছে। নারী বুঝে না যে, নারী নারীই। নারী ঘরনি হলে যেভাবে সে পুরুষের চিত্তাকর্ষক, তেমনি বিমানের পাইলট কিংবা কর্পোরেট হাউজের এক্্িরকিউটিভ হলেও সে আপন মহিমায় বিভূষিত। সে নিজেকে আকর্ষণীয় অবয়বে প্রদর্শন করলে বা কোনোভাবে প্রদর্শিত হলে পুরুষ আকর্ষিত হবেই। নারী যদি করা সেন্ট বা সুগন্ধিজাতীয় বস্তু ব্যবহার করে, উগ্র, আপত্তিকর ও যৌন উত্তেজক পোশাক পরিধান করে, অসামাজিক ও অস্বাভাবিক ফ্যাশন ও সাজসজ্জায় সেজেগুজে রাস্তা দিয়ে নিতম্ব দুলিয়ে দুলিয়ে হেটে যায়, পুরুষের কামভাব জেগে উঠবেইÑ এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এমন সব দৃশ্য দেখার পরও যদি কারও কামনা জাগ্রত না হয়, তবে তার সুস্থ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আধুনিকতার স্লোগানে নারী আজ চরম মোহগ্রস্ত ও প্রতারিত। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতোই এক শ্রেণীর প্রতারক পুরুষ নারীকে নিক্ষেপ করছে গভীর অন্ধকূপে। নারী তার মান-ইজ্জত ও সম্ভ্রম হারিয়ে হয়ে পড়েছে চরম নিঃসঙ্গ। নারী আজ দিশে হারিয়ে দিগ্ধিবিদিক ছুটোছুটি করছে। কোথায়ও তার আশ্রয় নেয়ার জায়গা নেই। পথের মোড়ে মোড়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে ধোঁকাবাজ লম্পট নরপশু। তারা নারীকে কুড়ে কুড়ে খেতে চায়। কামড়ে খামচে তাদের কামনা নিবারণ করতে চায়। তাদেরকে বানাতে চায় কাম ও লালসাসেবী। তাদের হিং¯্র ছোবল থেকে নারী নিজেকে রক্ষা করতে চায়।
নারীরা আজ পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণে আকন্ঠ নিমজ্জিত। তাদের মতো স্কার্ট, মিনি স্কার্ট, মাইক্রো স্কার্ট পরে শরীরের আকর্ষণীয় আঙ্গগুলো প্রদর্শন করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আধুনিকা সাজতে গিয়ে নারীরা উগ্র ও যৌন আবেদনময়ী পোশাক পরে পাড়ায় পাড়ায় রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। এসব উদ্ভট সাজ-পোশাকে সে যখন বাইরে বের হয়, পাড়ার বখে যাওয়া উঠতি তরুণরা তাকে দেখে শিশ দেয়, হাততালি দেয়, আশালীন মন্তব্য করে, নোংরা কথা বলে আরও নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। নারীর প্রতি অনৈতিক চিন্তা ও কাজে সরাসরি প্রলুব্ধ হচ্ছে। এতে কর্মক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা সহকর্মী দ্বারা লাঞ্ছিত হচ্ছে। এমনকি শিক্ষক ও সহপাঠী দ্বারাও হয়রানির শিকার হচ্ছে। ইদানিং ‘লেগিংস’ নামে মেয়েদের অদ্ভুত এক প্যান্টের আবির্ভাব হয়েছে। এগুলো মেয়েদের পদযুগলের সঙ্গে এতই আঁটসাট হয়ে লেগে থাকে যে, তাদের শরীরের অবয়ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এসব দেখে পুরুষের দৃষ্টি কামার্ত হয়ে ওঠে। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারী যেভাবে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে প্রদর্শিত হচ্ছে, তাতে মূলত নারীই প্রধান পণ্যে পরিণত হচ্ছে। এমনকি যেসব পণ্য নারীর জন্য প্রযোজ্য নয়, সেসব পণ্যের বিজ্ঞাপনেও নারী উত্তেজক রূপে হাজির হচ্ছে। সিনেমার নায়িকা থেকে সাইড নায়িকা, নর্তকী থেকে নিয়ে টিভি সিরিয়াল ও নাটকেও নারী যেভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তাতে নারী ভোগবাদী সমাজপতীদের তাদের ওপর উপগত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ইন্টারনেট এবং গণমাধ্যমে নারী যৌন আবেদনময়ী ও উপভোগ্য হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে। এসবই ধর্ষণ ও নারীর যৌন হয়রানিকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। মোটকথা ধর্ষণ বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ হিসেবে পুরো দোষটা কিন্তু নারীর ঘাড়েই পড়ছে। অর্থাৎ নারীই পুরুষকে তার ওপর উপগত হতে সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।
অপরদিকে নারী পক্ষ বলছে, নারী যেভাবেই চেলাফেরা করুক সেটা তারা করতেই পারে। পুরুষের মানসিকতা ঠিক করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কারণ ৪-৫ বছরের যে নিষ্পাপ শিশুটি ধর্ষিতা হয়, তার তো শারীরিক নগ্নতা প্রদর্শনের কিছু নেই। সেও কিন্তু ধর্ষিতা হচ্ছে। বুঝা গেল নারীর অবাধ নগ্নতা প্রদর্শনই ধর্ষণ বৃদ্ধির আখেরি কথা নয়। পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষিত হওয়ার কারণে যদি ধর্ষণ হয়, তাহলে সমাজের সব পুরুষই ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হত। তা তো হচ্ছে না। সবাইতো নারীকে কামনা করে জোর করে ভোগ করার প্রচেষ্টা চালায় না; বরং অতি অল্প কিছু বিকারগ্রস্ত মানুষ এই জঘন্য কর্মে লিপ্ত হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পুরুষরা বলবান হওয়ার কারণে পুরুষরা নারীকে লালসা মেটানোর সবচেয়ে নমনীয় শিকার হিসেবে ভাবে। তাছাড়া ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার কারণেও পুরুষ ধর্ষণকর্মে সাহস পেয়ে যায়। নারীকে নিয়ে বাণিজ্যিকীকরণ, বিজ্ঞাপন ও ইভেন্টে নারীকে ক্রমাগত দেহসর্বস্ব যৌন লালসার ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন পুরুষকে ধর্ষণের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। মোবাইল কোম্পানির সিম বিক্রি থেকে নিয়ে জুস, আচার, কোল্ড ড্রিঙ্কস, দাঁত মাজার পেস্ট, গায়ে মাখার সাবান, বাড়ি তৈরির সিমেন্ট, গাড়ি, বাড়ি সব বিজ্ঞাপনে নারীকে উপস্থাপন করা হয় আবেদনময়ী করে। আবার পত্রিকার কাটটি বাড়াবার জন্য নগ্ন দেহের সুন্দরী মডেলের ছবি প্রচারিত হয়। তাছাড়া মোবাইল ইন্টারনেটে পুরুষরা যে পর্ণো ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে, উঠতি তরুণ থেকে শুরু করে অনেক যুবকরাও এসবের প্রতি আসক্ত। তারা এগুলো দেখে দেখে শরীরে যে উত্তাপ অনুভব করে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ধর্ষণের মাধ্যমে। প্রশ্ন হচ্ছে এ কাজগুলো করছে কারা ? এ কাজগুলো করছে পুরুষরা। আরও খুলে বললে বলতে হয়, আমাদের দেশের কর্পোরেট ব্যবসায়ী ও সমাজের সবচে উঁচুশ্রেণীর শিক্ষিত লোকজন ও কথিত সুশীল সমাজ। সুতরাং ধর্ষণের পেছনের সব দায় নিতে হবে পুরুষদের।
কেউ আবার দোষাদোষি বাদ দিয়ে অন্যভাবে ভাবছেন। তাদের ধারণা, সামাজিক অজ্ঞতা ও কুসংস্কার পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও নানা কুসংস্কারকে দায়ি করেন। কেউ কেউ আবার এর সঙ্গে ধর্মকে টেনে আনার জোর প্রচেষ্টা চালান। তারা নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী স্বাধীনতায়ও ধর্মকেই বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চালান। এমনকি সামাজিক কুসংস্কারের মতো ধর্মীয় কুসংস্কার নামেও একটি ধারণাকে সামাজ-হৃদয়ে বদ্ধমূল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, সমাজের যারা ধর্মকে নারী উন্নতি ও প্রগতির অন্তরায় মনে করেন, তারা কিন্তু সিনেমার পোস্টার, বিলবোর্ড, পত্র-পত্রিকার বিনোদন পাতায় নারীর নগ্ন ছবি প্রদর্শন, অশ্লীল নৃত্য, বিয়ে বর্হিভূত অবৈধ প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ও অবাধ যৌনতার বিরোধিতা কখনো করেন না বা করতে দেখা যায় না। বরং এগুলোকেই প্রগতি ও আধুনিকতা সাব্যস্ত করে এর বিরোধিতাকারীদের পশ্চাতপদ ও প্রগতিবিরোধী কিংবা মৌলবাদী বলে বিষোদগার করতে দেখা যায়।
আবার কারও ধারণা, ছেলেবন্ধু আর মেয়েবন্ধু নামে যে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে, তাও পুরুষকে ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ প্রতিটি পুরুষ যৌন তাড়নায় কাতর। প্রতিটি পুরুষের ভেতরই বাস করে একজন কুৎসিত ধর্ষণকামী মানুষ। যখনই সে সুযোগ পায় সে তার মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগায় এবং তার আসল রূপে আবির্ভূত হয়। সে শুধু একটি মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। নারীর কাছ থেকে তার লালসা মেটানোর জন্যই সে শুধু ছেলেবন্ধুর ভান করে। মোটকথা নারী ধর্ষণ দিন দিন বেড়েই চলছে। বিবাহিত নারীদের প্রতি চারজনের একজন স্বামীর নির্যাতনের শিকার। বিশেষত নারীকে পণ্য করে বাজারে তোলার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা ধর্ষণ-নির্যাতনের অন্যতম কারণ। ধর্ষণ একটি রিপুতাড়িত লিপ্সা। মানুষ যখন বিপরিত লিঙ্গের প্রতি প্রবল আকর্ষিত হয় তখন সে ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ষকরা কি জন্মগতভাবেই ধর্ষণকর্মে অভ্যস্ত হয়? ধর্ষক চাই পুরুষ হোক বা নারী, জন্মগতভাবেই কেউই বোধ হয় ধর্ষণকর্মে উদ্বুদ্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। মূলত পরিবেশ-পরিস্থিতি পারিবারিক অবস্থান, কর্মক্ষেত্রসহ অনেক কিছুর সমন্ময়ে মানুষ ধর্ষণে প্রলুব্ধ হয়ে ওঠে। ধর্ষণ মানুষের সাধারণ কোনো আচরণ নয়। এটি হচ্ছে অস্বাভাবিক আচরণ ও বিকারগ্রস্ততার বহিঃপ্রকাশ। বিকারগ্রস্ত মানুষের পক্ষেই কেবল ধর্ষণের মতো অসামাজিক ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করা সম্ভব। তবে খোঁজ নেয়া দরকার যে, ধর্ষণ কাকে বলে? এবং কেন আমাদের সমাজে ধর্ষণের জঘন্য অপরাধ উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে ? এর নেপথ্য কারণই বা কী ?

উইকিপিডিয়া অনুযায়ী ধর্ষণ হলো Rape is a type of sexual assault usually involving sexual intercourse (or other forms of sexual penetration) initiated against one or more individuals without the consent of those individuals. The act may be carried out by physical force, coercion, abuse of authority or against a person who is incapable of valid consent, such as one who is unconscious, incapacitated, or below the legal age of consent.
বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের যেসব সজ্ঞা ও বিবরণ এসেছে :
দ-বিধি ১৮৬০ ঃযব ঢ়বহধষ পড়ফ ১৮৬০ : ধারা ৩৭৫-৩৭৬
  1. A man is said to commit “rape” who except in the case hereinafter excepted, has sexual intercourse with a woman under circumstances falling under any of the five following descriptions:
Firstly. Against her will.
Secondly. Without her consent.
Thirdly. With her onsent, when her consent has been obtained by putting her in fear of death, or of hurt.
Fourthly. With her consent, when the man knows that he is not her husband, and that her consent is given because she believes that he is another man to whom she is or believes herself to be lawfully married.
Fifthly. With or without her consent, when she is under fourteen years of age.
Explanation. Penetration is sufficient to constitute the sexual intercourse necessary to the offence of rape.
Exception. Sexual intercourse by a man with his own wife, the wife not being under thirteen years of age, is not rape.
  1. Whoever commits rape shall be punished with 2[imprisonment] for life or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine, unless the woman raped is his own wife and is not under twelve years of age, in which case he shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both.
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এ রয়েছে :   ৯/ (১) যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রমে কারাদ-ে দ-নীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদ-েও দ-নীয় হইবেন।
ব্যাখ্যা : যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত (২) (ষোল বৎসরের) অধিক বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা (৩) (ষোল বৎসরের) কম বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।
(২) যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদ-ে বা যাবজ্জীবন সশ্রমে কারাদ-ে দ-নীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অনুন্য এক লক্ষ টাকা অর্থদ-েও দ-নীয় হইবেন।
(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদ-ে বা যাবজ্জীবন সশ্রমে কারাদ-ে দ-নীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অনুন্য এক লক্ষ টাকা অর্থদ-েও দ-নীয় হইবেন।
(৪) যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকেÑ
(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-ে দ-নীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদ-েও দ-নীয় হইবেন;
(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদ-ে দ-নীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদ-েও দ-নীয় হইবেন।
(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোনো নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বৎসর সশ্রম কারাদ-ে দ-নীয় হইবেন।
টিকা দুটিতে আছে : “ষোল বৎসরের” শব্দগুলি “চৌদ্দ বৎসরের” শব্দগুলির পরিবর্তে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩ (২০০৩ সনের ৩০ নং আইন) এর ৩ ধারাবলে প্রতিস্থাপিত।
পবিত্র কুরআনে ধর্ষণকে ‘যিনা’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। শিরক ও হত্যার পর ‘যিনা’ সবচেয়ে জঘন্য গুনাহ। “এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদত করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজ করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে। কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। [আলফুরকান : ৬৮-৭০] অন্যত্র মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। [ইসরা, ৩২] ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, ওলামায়ে কেরাম বলেন, ‘যিনা কর না’ এরচেয়ে ‘যিনার কাছেও যেয়ো না’ অনেক বেশী কঠোর বাক্য। এর অর্থ যিনার ভূমিকায় যেসব বিষয় থাকে, সেগুলোও হারাম।

ইসলামের দৃষ্টিতে যিনার শাস্তি
ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তির পরিবর্তনের কারণে যিনার শাস্তিও পরিবর্তন হয়। যিনাকারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যের পাথর মেরে মৃত্যুদ- দেয়া হবে। আর যদি অবিবাহিত হয় তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশত বেত্রঘাত করা হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহ তাআলার বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। [নূর : ২]

অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মনে করছেন, এসব সামাজিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কারণ হলো অশিক্ষা ও দারিদ্র্য। অনেকে আবার এসব সমস্যার মূলে আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকাকেই দায়ী করেন। চলুন দেখা যাক আসল রহস্যটা কোথায় ?
অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ধর্ষণকর্মে সাধারণত পুরুষরাই লিপ্ত হয়। নারীরা সাধারণত ধর্ষকের ভূমিকায় থাকে না। তবে তাদের দ্বারা যেটা হয়, সেটা হলো ধর্ষণকর্মে মৌন সমর্থন বা পুরুষকে উপগত হতে খানিকটা সুযোগ করে দেয়া। তবে নারী সৃষ্টিগত লজ্জা, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক বিধি-নিষেধ ইত্যাদি কারণে সরাসরি বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে উপগত হতে বাধাপ্রাপ্ত হয় বা নিবৃত থাকে। তবে পুরুষ কিছুটা বলবান, সামাজি অবস্থান দৃঢ়, সমাজ পুরুষ শাসিত, সৃষ্টিগতভাবে পুরুষ কিছুটা রুক্ষ স্বভাবের ইত্যাদি কারণ বিবেচনায় পুরুষকেই ধর্ষকের ভূমিকায় দেখা যায়। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তবে তার মাত্রা একেবারেই কম। দু’একটি যা হয় তাও অনভিপ্রেত ও অপ্রত্যাশিত। সুতরাং বলা যায়, পুরুষরাই ধর্ষণকর্ম করে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে পুরুষরা তো আর জন্মগতভাবে ধর্ষক হয়ে জন্মগ্রহণ করেন না। তাহলে কেন তারা ধর্ষণের প্রতি আর্কষিত হয়ে পড়েন ?
নারীকে মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিগতভাবেই সুন্দর দেহ-সৌরব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তার চাল-চলন, কথা-বার্তা, হাসি-ঠাট্টা, তার চাহনি সব কিছুতেই একটা আকর্ষণভাব থাকে। সুতরাং নারী যখন তার আকর্ষণীয় বিষয়গুলো প্রদর্শন করে তখন পুরুষরা আকর্ষিত হবেÑ এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
নারীকে পণ্য করে উপস্থাপনের যে প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য দায়ি কারা? মসজিদের ইমাম সাহেব নাকি টিভি টকশোতে নিয়মিত যারা প্রোগ্রাম করে জাতির উন্নত বিবেক সাজেন, সেই কথিত ভদ্র নামের লোকগুলো। একটি মোবাইল কোম্পানি তাদের বিলবোর্ড টানাবে সেখানেও তিন তিনটি মেয়েকে উগ্রবাচনভঙ্গিতে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। নৌকায় দেয়ার জন্য আলকাতরা কিনলেও সেখানে একটি নারী যৌনআবেদনময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আধুনিকতা আমাদের সমাজমানসে এমনভাবে ঢুকেছে যে, এখন সভ্যতা বলতে কিছু নেই। পশ্চিমারা যাই পাঠাচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়েরা, যুবক-যুবতীরা সেগুলোকেই দেদারছে গিলছে। যৌনআবেদনময়ী ও আঁটসাট পোশাক পরে, নগ্ন, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ানোর সংস্কৃতি আমাদের ছেলে-মেয়েরা যেভাবে রপ্ত করেছে তাতে বিপরিত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার বহু কারণ রয়েছে। নারীর প্রদর্শনীয় অঙ্গগুলোকে প্রদর্শন করলে পুরুষের ভেতর অবশ্যই কামভাব জাগবে। মোবাইল ইন্টারনেটের এই যুগে পর্ণো ভিডিও খুবই সস্তা একটি অনুষঙ্গ। ইন্টারনেটের কল্যাণে এসব চরিত্র বিধ্বঃসী ভিডিও হাতের নাগালে পেয়ে যুবকরা সেগুলো দেখে দেখে শরীরের ভেতর যে উত্তাপ অনুভব করে তা প্রশমনের জন্য বেঁছে নেয় ধর্ষণের মতো কুকর্ম। সুতরাং ভেতরে চিকিৎসা না করে ওপরে যতই মলম লাগানো হোক, ধর্ষণ তাতে কিছুতেই বন্ধ হবে না।
একটি চরম সত্য কথা হলো, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা টিভি-টকশোতে যে যত পদ্ধতি আবিস্কার করেন, কোনো কিছুতেই ধর্ষণ নামক সামাজিক ব্যাধি বন্ধ হবে না। হওয়ার নয়। যার প্রমাণের জন্য কারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। সত্য কথা হলো, তরুণ সমাজে যতদিন ইসলাম চর্চিত না হবে, ততদিন এই ধরণের অপরাধগুলো বন্ধ হবে না। ইসলামই হচ্ছে আসল মুক্তির সনদ। অপসংস্কৃতির কৃষ্ণ কালো ধূ¤্রকুঞ্জ যে হারে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসকে গ্রাস করে চলেছে, তা এক কথায় ভয়াবহ। সাথে সাথে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে পাল্লা দিয়ে অপসৃত হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক আদর্শ। সে শূন্যস্থান পূরণ করছে মানুষের জৈবিক ও পাশবিক চিন্তাধারা। মানুষের সবকিছুতে জৈবিক চিন্তাধারা ঢুকে যাওয়ার কারণে নৈতিক অবক্ষয় ও অধঃপতন এমনভাবে তরান্বিত হচ্ছে, যার কারণে মানুষের মনুষ্যত্বশক্তি লোপ পেয়ে সেখানে আসন গেড়ে বসেছে পাশবিকশক্তি। ফলশ্রোতিতে আজ নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, নারী অপহরণ ইত্যাদি অপরাধগুলো সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
ধর্ষণ এমন এক প্রবণতা যা ধর্মীয়, সামাজিক, ও আদর্শিক সব মাপকাঠিতেই জঘন্যতম অপরাধ। শুধু ইসলামই নয় ; বরং সব ধর্ম ও মানুষের কাছে এটি সর্বাধিক ঘৃণিত বিষয় বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে। আমাদের সমাজে এ ধরনের নৈতিক অপরাধ-প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে। অপরাধ দমনের জন্য বহু আইন তৈরি করা হচ্ছে; কিন্তু তা অপরাধ দমনে কার্যকর ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ দমনের প্রধান ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা হলো তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় মানুষের অন্তরে জাগিয়ে তোলা। ইসলাম ব্যক্তির মনমানসিকতায় আল্লাহর ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতার প্রত্যয় সৃষ্টি করার প্রতিই বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। মানুষকে পরিস্কারভাবে একথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, যত সংগোপনেই সে অপরাধ করুক না কেন, আল্লাহ তাআলা তা দেখেন। পরকালে আল্লাহর কাছে এ জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। পরকালে ভালো-মন্দ বিচারের মাপকাঠি হবে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। যার ভেতর আল্লাহর ভয় যত বেশী থাকবে সে তত বেশী আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মাঝে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও সম্মানিত যে তোমাদের মাঝে অধিক মুত্তাকী।’ [সূরা হুজরাত : ১৩]
মানব জীবনে তাকওয়ার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজেকে কু-প্রবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে রাখে নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাস্থল। ’ [সূরা নাযি’আত : আয়াত ৪০-৪১] অন্য আয়াতে আছে, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর মনে রেখ, নিশ্চয় তিনি মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন। ’ [সূরা বাকারা : আয়াত ১৯৪] বস্তুত মানুষের মাঝে যদি এই ভয় উপস্থিত থাকে যে, কারও ইজ্জত লুন্ঠন করলে, কাউকে ধর্ষণ করলে, কাউকে উত্তক্ত করলে আল্লাহ তাআলার কাছে একদিন এর জবাব দিতে হবে এবং কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে, তবেই সে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। পাবন্দির সঙ্গে আল্লাহ তাআলার হুকুম মানা তার জন্য সম্ভব হবে। তাই ইসলাম সব ধরনের অপরাধ-প্রবণতা দমনের জন্য মানুষের মনে তাকওয়ার বিজ বপন করার মনোভাব পোষণ করে। কারণ অপরাধ দমনে এটিই কার্যকর ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা। হযরত ওমর রা. এক রাতে মানুষের খোঁজখবর নেয়ার জন্য মদীনার অলিগলিতে টহল দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি ঘর থেকে কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেলেন। কথাবার্তার ধরন শুনে তার কৌতূহল হল। তিনি ঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন এবং শুনতে পেলেন, এক বৃদ্ধা তার মেয়েকে বলছে, ‘বেটি ! আজ তো উটের দুধ কম হয়েছে। দুধের সঙ্গে একটু পানি মিশিয়ে দাও। ’ মেয়ে উত্তরে বলল, ‘মা ! আমিরুল মুমিনীন তো দুধের সঙ্গে পানি মেশাতে নিষেধ করেছেন। ’বৃদ্ধা বলল, ‘আমিরুল মুমিনীন কি আমাদের দেখছেন ? তিনি হয়ত নিজ ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। তুমি নিশ্চিন্তে পানি মেশাতে পার।’ এবার মেয়ে বলল, ‘মা ! আমিরুল মুমিনীন এখানে নেই এবং তার কোনো লোকও নেই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো আছেন। তিনি তো দেখছেন। তার কাছে কী জবাব দেব ? এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে, একটি সাধারণ মেয়ের অন্তরে মহান আল্লাহ তাআলার ভয় থাকার কারণে রাতের অন্ধকারেও সে অন্যায় থেকে বিরত থেকেছে।
মোটকথা, মানুষের অন্তরে যদি সর্বক্ষণ এই চিন্তা জাগরূক থাকে যে, মহান আল্লাহ তাআলা আমাকে দেখছেন, তাহলেই সে নিজেকে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পূত-পবিত্র রাখতে পারে। এই অনুভূতির নামই তাকওয়া। তাই প্রথমত সামাজিক অপরাধ দমনের জন্য সমাজের সর্বস্তরে তাকওয়া-পরহেযগারী প্রতিষ্ঠা করার প্রতি আমাদের সবাইকেই সচেষ্ট হতে হবে। দ্বিতীয়ত : ধর্ষণ, ব্যভিচার ইত্যাদি নৈতিক অপরাধের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করার জন্য ইসলাম এর কঠিন শাস্তির বিধান দিয়েছে। কাজটি যেমন জঘন্য, শাস্তিও তেমন কঠিন। উদ্দেশ্য হলো এই পাপের উৎসমূল চির রুব্ধ করে দেওয়া। ব্যভিচারীর অবস্থাভেদে ব্যভিচারের শাস্তিও একটু ভিন্ন। ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে একশ’টি বেত্রাঘাত অবস্থাভেদে পাথর মেরে প্রাণনাশের বিধান দেয়া হয়েছে। যিনাকারী যদি বিবাহিত হয় তাহলে তাদেরকে প্রস্তাঘাতে মৃত্যুদ- দেয়া হবে। আর ব্যভিচারী যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাদেরকে প্রকাশ্যে একশত বেত্রাঘাত করা হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভিচারী নারী, ব্যভিচারী পুুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরকরণে তাদের প্রতি তোমাদের মনে যেন দয়ার উদ্রেক না হয়। যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। [সূরা নুর : ২] হাদীস শরিফে আছে, অবিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে একশত বেত্রাঘাত ও রজম (পাথর মেরে মৃত্যুদ-)। [সহিহ মুসলিম] ধর্ষণকারী অবিবাহিত হলে অন্য মাজহাবের ফকিহদের মতে তার শাস্তি হলো দুটি। ১. একশ’ বেত্রাঘাত। ২. এক বছরের জন্য দেশান্তর। অবশ্য হানাফী মাজহাব মতে ধর্ষণকারী যদি অবিবাহিত হয়, তবে তার হদ বা শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি হলো, একশ’ বেত্রাঘাত। আর দেশান্তরের বিষয়টি বিচারকের বিবেচানাধীন। তিনি ব্যক্তি বিশেষে তা প্রয়োগ করতে পারেন। অবশ্য ধর্ষণের মাঝে যেহেতু ধর্ষক অপরাধী হয় আর ধর্ষিতা নির্যাতিত হয়, তাই ধর্ষণের ভেতর শুধু ধর্ষকের শাস্তি হবে। ধর্ষক এখানে দুই ধরনের শাস্তি পাবে। যেহেতু তিনি একদিকে যিনা করে থাকে, অন্য দিকে আবার বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন করে থাকে, তাই তিনি দুই ধরনের শাস্তি পাবেন। যিনার শাস্তি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ভীতিপ্রদর্শনের জন্য মুহারাবা তথা ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করার শাস্তি পাবে। মুহারাবার শাস্তির ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা তাদেরকে শূলীতে চড়ানো হবে। অথবা তাদের হস্তদ্বয় বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিস্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। [সূরা মায়িদা : ৩৩]
মোটকথা ইসলাম ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান দিয়েছে। সুতরাং কেউ অপরাধী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ইসলাম নির্দেশিত শাস্তি প্রয়োগ করা হয়, তবে মানুষ ভয়ে হোক আর যেভাবেই হোক এ ধরনের অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে।
সমাজে দুর্নীতিই এখন নীতি, অশ্লীলতাই এখন শ্লীলতা, অসভ্যতা-বর্বরতাই সভ্যতা হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। আর ন্যায়বিচারের বাণী তো সমাজের সবচেয়ে নিচু তলার বাসিন্দা। সুতরাং এটা সুস্পষ্ট যে, সংস্কৃতির যে শ্লোগান ক্ষণে ক্ষণে উচ্চারিত হচ্ছে সেমিনার-মিডিয়ায় সর্বত্র তা অর্থহীন ফাঁপা কিছু বুলি মাত্র। যার বাস্তবতা নেশা ধরানো রং-তামাশা, আনন্দ-উন্মাদনা উপভোগের মত অমৌল বিষয়কে ঘিরেই পরিবৃত্ত, রিপুচর্চাই যার মূখ্য উদ্দেশ্য। মৌলিক যে সংস্কৃতি মানবের মন ও মননের বিকাশ ঘটায়, চেতনারাজ্যকে রুচিবোধ, আত্মমর্যাদা, সৃজনশীলতার আলোচনায় উদ্ভাসিত করে, সর্বোপরি মানুষকে মানুষ হিসেবে, গড়ে ওঠার প্রেরণায় উজ্জীবিত করে তা দেওয়ার ক্ষমতা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় নেই।