Tuesday, 2 December 2014

কতিপয় কবীরা গুনাহের বিস্তারিত বিবরণ ৩৬-৪৬

  • ৩৬. দাইয়ুসিয়াত অর্থাৎ নিজের স্ত্রী, বোন বা কণ্যাকে পরপুরুষের সাথে অবাধে দেখা-সাক্ষাত, মেলা-মেশা করতে দেওয়া, পরপুরুষের বিছানায় যেতে দেওয়া জঘন্য কবীরা গুনাহ ও হারাম। এটা জাহিলিয়্যাতের যুগের একটি জঘন্য পাপ, যা ইউরোপ-আমেরিকার বর্বরতা ও আধুনিক সভ্যতার যুগে আবার চালু হয়েছে। এটা অতি জঘন্য পাপপ্রথা ও ভয়াবহ কবীরা গুনাহ।

    ৩৭. ঘোড় দৌড় বা রেস খেলা কবীরা গুনাহ। যেহেতু এতে বাজি ধরা হয়েছে। আর যাতে বাজি ধরা আছে, তা জুয়া। অতএব, এটা হারাম ও মহাপাপ।

    ৩৮. সিনোমা, টিভি ইত্যাদি দেখা কবীরা গুনাহ। কারণ, এর মধ্যে উত্তেজনামূলক ছবি দেখানো হয়, যদ্দারা যুবকদের স্বাস্হ্য নষ্ট, সময় নষ্ট, সম্পদ নষ্ট, স্বভাব নষ্ট ও মাতৃজাতির অবমাননা করা হয় এবং হায়া-শরম যা দ্বীনের ওপর কায়িম থাকার জন্য অপরিহার্য, তা একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। এজন্য এটা জঘন্য পাপ। সিনেমার পার্ট ও প্লে করা, সিনেমার ব্যবসা করা, এর এডভার্টাইজিং করা সবই কবীরা গুনাহ ও মহাপাপ।

    ৩৯. পেশাব করে পানি না নেওয়া ও পাক-পবিত্র না হওয়া কবীরা গুনাহ। পেশাবের ছিঁটা-ফোটা থেকে বেঁচে না থাকার দরুন কবর আযাব হয়।হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করে গিয়েছন। খৃষ্টানরা পেশাব করে পানি ব্যবহার করে না। পশুর মতো দাঁড়িয়ে পেশাব করে। তাদের দেখাদেখি যারা তদ্রূপ করে তারা বড়ই হতভাগ্য।

    ৪০. চোগলখুরি করা ও কূটনামী করা কবীরা গুনাহ।

    ৪১. গণকের কাছে যাওয়া মহাপাপ ও কবীরা গুনাহ।

    ৪২. মানুষের বা অন্য কারো জীবের ফটো আদর-যত্নসহকারে ঘরে রাখা বা টাঙ্গানো কবীরা গুনাহ।

    ৪৩. পুরুষের জন্য সোনার আংটি পরা কবীরা গুনাহ।

    ৪৪. পুরুষের জন্য রেশমী পোষাক পরা কবীরা গুনাহ।

    ৪৫. মেয়েলোকের জন্য শরীরের রূপ প্রকাশ পায়, এমন পাতলা লেবাস পরা কবীরা গুনাহ। তেমনি কোন অঙ্গের অংশবিশেষ বের করে সংক্ষিপ্ত পোষাক পরা বা অঙ্গের পরিধি ফুটে ওঠার মতো আঁটসাঁট পোষাক পরাও কবীরা গুনাহ।

    ৪৬. পুরুষের জন্য লুঙ্গি, পায়জামা ও প্যান্ট পায়ের গিরার নিচে পরা কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শরীফে ইরশাদ করেছেন, “মাটির উপর দিয়ে গর্বভরে বিচরণ করো না।” তিনি আরো বলেছেন, “আল্লাহর নিকট মানুষের অহংকার ও ফখর অত্যন্ত অপছন্দনীয়।”

    হাদীস শরীফে হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দিকে আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন রহমতের দৃষ্টি দিবেন না। তাদের সাথে মেহেরবানির কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। তারা হলো-১.যে অহংকারের সাথে লুঙ্গি-পায়জামা টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরবে, ২.যে উপকার করে খোঁটা দিবে, ৩.যে মিথ্যা কসম খেয়ে জিনিস বিক্রয় করবে।
  • শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।

কতিপয় কবীরা গুনাহের বিস্তারিত বিবরণ ৩০-৩৫

  • ৩০. জায়গা-জমির সীমানা নষ্ট করা কবীরা গুনাহ। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জায়গা-জমির সীমানা যে নষ্ট করবে, তার ওপর লানত।”

    হাদীসে আরো বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি জায়গা-জমির সীমানা নষ্ট করে অন্যের এক বিঘত জমি হরণ করবে, কিয়ামতের দিন তার স্কন্ধে এই পরিমাণ সাত তবক জমিন চাপিয়ে দেওয়া হবে।” [সূত্র : মুসলিম শরীফ, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-৩২]

    ৩১. শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়া কবীরা গুনাহ। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে লোক শ্রমিকের শ্রমের পূর্ণ মজুরি দেয় না বা পূর্ণ মজুরি দিতে টাল-বাহানা করে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে বাদী হয়ে আল্লাহর দরবারে দাঁড়াব।” হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাষ্ট্রানুগত সংখ্যালঘুর ওপর জুলুমকারী সম্পর্কেও এরূপ উক্তি করেছেন।

    ৩২. মাপে কম দেওয়া কবীরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-“যারা মাপে কম দিবে, তাদের জন্য ওয়ায়েল নামক দোযখ নির্ধারিত রয়েছে।”

    ৩৩. দ্রব্য সামগ্রীতে ভেজাল মিশ্রিত করা কবীরা গুনাহ।

    ৩৪. খরিদ্দারকে ধোঁকা দেওয়া কবীরা গুনাহ। হাদীস শরীফে আছে- “যে ধোঁকা দিবে, সে আমার উম্মত নয়।”

    ৩৫. স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে, শর্তের সাথে হিলা করে পুনরায় তাকে নিয়ে ঘর-সংসার করা কবীরা গুনাহ। একে তো তালাক কথাটাই এমন, যা অত্যন্ত ঘৃণিত। কেবলমাত্র জরুরতের কারণেএটাকে জায়িয রাখা হয়েছে। নতুবা এর চেয়ে জঘন্য কাজ আর নেই। তাই হাদীস শরীফে বলা হয়েছে- “যত রকমের জায়িয জিনিস আছে, তন্মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জিনিস হচ্ছে তালাক।” [সূত্র : আবু দাউদ শরীফ খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২৯৬] তারপর একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে ফেলা, এটা আরো খারাপ। আবার তিন তালাকের দ্বারা যে স্ত্রী হারামে মোগাল্লাযা হয়ে গেছে, তাকে শর্ত করে হিলার মাধ্যমে ঘরে রাখা খুবই জঘন্য ব্যাপার। এজন্যই হাদীস শরীফে উভয়ের ওপর লানত বর্ষিত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে হিলা করবে এবং যার জন্য হিলা করা হবে, উভয়ের ওপরই লানত বর্ষিত হবে।” [সূত্র : মিশকাত শরীফ।]

    হযরত উমর (রাযি) এর যুগে আইন ছিল, যদি কেউ এভাবে হিলা করতো, তবে তাকে সাঙ্গেসার করা হতো অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপ করে তাকে মেরে ফেলা হতো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের নিকট জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, এক ব্যক্তি তার চাচাত বোনকে বিবাহ করে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তাকে তিন তালাক দিয়েছে, এখন আবার হিলা করে তাকে স্ত্রীরূপে রাখতে চায়। তিনি ফাতাওয়া দিয়েছিলেন, তোমার চাচাত ভাই একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে আল্লাহপাকের নাফরমানি করেছে। আল্লাহ তাকে এই শাস্তি দিয়েছেন। সে শয়তানের তাবেদারি করেছে, তাই আল্লাহপাক তার জন্য আর কোন পথ বাকি রাখেন নি। সকল ইমামগণের ফাতাওয়াই এরূপ যে, শর্ত করে হিলা করা হারাম ও গুনাহে কবীরা।
  • শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।

স্বামীর নাফরমানি করা কবীরা গুনাহ

স্বামীর নাফরমানি করা কবীরা গুনাহ। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিন প্রকার লোকের ইবাদত-বন্দেগী যেমন নামায-রোযা ইত্যাদি কবুল হয় না। যথা-ক. ক্রীতদাস, যদি তার প্রভুর নিকট হতে পলায়ন করে, খ. স্ত্রী, যদি তার স্বামীকে নারাজ রাখে, গ. মদখোর, যে নেশা পান করে”। [সূত্র : ছহীহে ইবনে খুজাইমা, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-৬৯, হাদীস-৯৪০]

একজন মেয়েলোক স্বামীর হক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাকে হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,“খবরদার, সাবধান থাক!সবসময় লক্ষ্য রেখ, স্বামীর মনের মধ্যে তুমি আছ কি না? জেনে রেখ, পতিই সতীর গতি। স্বামীই স্ত্রীর বেহেশত অথবা দোযখ।”
হযরত আয়েশা সিদ্দীক (রাযি) বর্ণনা করেন, “হে কন্যাসকল! তোমরা নারী জাতি। তোমরা যদি তোমাদের স্বামীর হক সম্পর্কে জানতে, তবে প্রত্যেক নারী তার স্বামীর পায়ের ধুলা-কাদা মুখের দ্বারা সাফ করতো।”

হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলার আইনে যদি কারো জন্য কোন মানুষকে সিজদা করা জায়িয হতো, তবে আমি প্রত্যেক স্ত্রীকে আদেশ করতাম, তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।” [সূত্র: তিরমিযী শরীফ, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২১৯ ও তাবারানী কাবীর খন্ড, হাদীস-৫১১৭]

স্বামীর হক স্ত্রীর ওপর এত বেশি। প্রত্যেক স্ত্রীর ওপর ওয়াজিব-হায়া-শরম সহকারে স্বামীর সামনে চক্ষু নিচু করে রাখা এবং স্বামীর প্রত্যেকটি আদেশ পালন করা এবং স্বামী যখন কথা বলেন, তখন চুপ করে থাকা। যখনই স্বামী বাড়ি আসেন, তখনই তার কাছে এসে তার প্রতি সম্মান করা এবং যে সমস্ত কাজে স্বামী অসন্তুষ্ট হন, সেই সমস্ত কাজ থেকে দূরে থাকা। আর যখন স্বামী বাইরে যান, তখন তার যাবতীয় নির্দেশ মুতাবিক কাজ সমাধা করা। স্বামী যখন শয়ন করেন, তখন নিজেকে তার সামনে পেশ করা এবং স্বামীর অনুপস্হিতিতে তার ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ, তার সন্তান-সন্ততি ও স্বীয় ইজ্জত-আব্রু হেফাযত করা, তাতে আদৌ কোনরূপ খিয়ানত না করা। সুগন্ধি ব্যবহার করে স্বামীর সামনে আসা এবং মুখ, শরীর, কাপড় যেন কোনরূপ দুর্গন্ধযুক্ত না হতে পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। স্বামীর উপস্হিতিতে সাজ-সজ্জা করা ও তার অনুপস্হিতিতে সাজ-সজ্জা না করা, স্বামীর ভাই-বোনদের ভালোবাসা, তাদেরকে আদর-যত্ন ও ইজ্জত সম্মান করা। স্বামী যা কিছু এনে দেয়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা, শোকর করা। স্বামীর বাড়ির বাইরে না যাওয়া। যদি প্রয়োজনবশত কোথাও যেতে হয়, তবে স্বামীর অনুমতি নিয়ে যাওয়া এবং ময়লা কাপড় পরিধান করে ও ময়লাযুক্ত বোরকা পরিধান করে যাওয়া। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- “যে মেয়েলোক তার স্বামীর বাড়ি হতে স্বামীর বিনা অনুমতিতে বাইরে যায়, তাঁর ওপর ফেরেশতাগণ লানত করতে থাকেন।”

ইসলাম ধর্মের ও মানব কল্যাণের অনেক শত্রু আছে। তারা বলে থাকে যে, পুরুষরা নারীদেরকে পরাধীন করে রেখেছে। এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভ্রান্ত। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহই স্ত্রীকে স্বামীর তাবেদারি করে চলতে নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
الرِّ‌جالُ قَوّ‌ٰمونَ عَلَى النِّساءِ بِما فَضَّلَ اللَّهُ بَعضَهُم عَلىٰ بَعضٍ وَبِما أَنفَقوا مِن أَمو‌ٰلِهِم ۚ فَالصّـٰلِحـٰتُ قـٰنِتـٰتٌ حـٰفِظـٰتٌ لِلغَيبِ بِما حَفِظَ اللَّهُ ۚ وَالّـٰتى تَخافونَ نُشوزَهُنَّ فَعِظوهُنَّ وَاهجُر‌وهُنَّ فِى المَضاجِعِ وَاضرِ‌بوهُنَّ ۖ فَإِن أَطَعنَكُم فَلا تَبغوا عَلَيهِنَّ سَبيلًا ۗ إِنَّ اللَّهَ كانَ عَلِيًّا كَبيرً‌ا ﴿٣٤﴾

“পুরুষরা নারীদের অভিভাবক।” [সূত্র : সূরাহ নিসা, আয়াত-৩৪]

ইসলাম যেমন নারীদেরকে স্বামীর পূর্ণ তাবেদারি করার হুকুম করেছে, তদ্রূপ স্বামীদেরকেও নির্দেশ দিয়েছে, নিজ স্ত্রীর প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য। র্দুব্যবহার বা জুলুম করতে অতি কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তাদেরকে দ্বীনি শিক্ষা দিতে এবং যথাসম্ভব তাদের ভুল-ত্রুটিকে মাফ করতে কঠোর তাগিদ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।”


  • শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।

কতিপয় কবীরা গুনাহের বিস্তারিত বিবরণ ২৯

  • ২৯. স্বামীর নাফরমানি করা কবীরা গুনাহ। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিন প্রকার লোকের ইবাদত-বন্দেগী যেমন নামায-রোযা ইত্যাদি কবুল হয় না। যথা-ক. ক্রীতদাস, যদি তার প্রভুর নিকট হতে পলায়ন করে, খ. স্ত্রী, যদি তার স্বামীকে নারাজ রাখে, গ. মদখোর, যে নেশা পান করে”। [সূত্র : ছহীহে ইবনে খুজাইমা, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-৬৯, হাদীস-৯৪০]

    একজন মেয়েলোক স্বামীর হক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাকে হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,“খবরদার, সাবধান থাক!সবসময় লক্ষ্য রেখ, স্বামীর মনের মধ্যে তুমি আছ কি না? জেনে রেখ, পতিই সতীর গতি। স্বামীই স্ত্রীর বেহেশত অথবা দোযখ।”
    হযরত আয়েশা সিদ্দীক (রাযি) বর্ণনা করেন, “হে কন্যাসকল! তোমরা নারী জাতি। তোমরা যদি তোমাদের স্বামীর হক সম্পর্কে জানতে, তবে প্রত্যেক নারী তার স্বামীর পায়ের ধুলা-কাদা মুখের দ্বারা সাফ করতো।”

    হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলার আইনে যদি কারো জন্য কোন মানুষকে সিজদা করা জায়িয হতো, তবে আমি প্রত্যেক স্ত্রীকে আদেশ করতাম, তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।” [সূত্র: তিরমিযী শরীফ, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২১৯ ও তাবারানী কাবীর খন্ড, হাদীস-৫১১৭]

    স্বামীর হক স্ত্রীর ওপর এত বেশি। প্রত্যেক স্ত্রীর ওপর ওয়াজিব-হায়া-শরম সহকারে স্বামীর সামনে চক্ষু নিচু করে রাখা এবং স্বামীর প্রত্যেকটি আদেশ পালন করা এবং স্বামী যখন কথা বলেন, তখন চুপ করে থাকা। যখনই স্বামী বাড়ি আসেন, তখনই তার কাছে এসে তার প্রতি সম্মান করা এবং যে সমস্ত কাজে স্বামী অসন্তুষ্ট হন, সেই সমস্ত কাজ থেকে দূরে থাকা। আর যখন স্বামী বাইরে যান, তখন তার যাবতীয় নির্দেশ মুতাবিক কাজ সমাধা করা। স্বামী যখন শয়ন করেন, তখন নিজেকে তার সামনে পেশ করা এবং স্বামীর অনুপস্হিতিতে তার ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ, তার সন্তান-সন্ততি ও স্বীয় ইজ্জত-আব্রু হেফাযত করা, তাতে আদৌ কোনরূপ খিয়ানত না করা। সুগন্ধি ব্যবহার করে স্বামীর সামনে আসা এবং মুখ, শরীর, কাপড় যেন কোনরূপ দুর্গন্ধযুক্ত না হতে পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। স্বামীর উপস্হিতিতে সাজ-সজ্জা করা ও তার অনুপস্হিতিতে সাজ-সজ্জা না করা, স্বামীর ভাই-বোনদের ভালোবাসা, তাদেরকে আদর-যত্ন ও ইজ্জত সম্মান করা। স্বামী যা কিছু এনে দেয়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা, শোকর করা। স্বামীর বাড়ির বাইরে না যাওয়া। যদি প্রয়োজনবশত কোথাও যেতে হয়, তবে স্বামীর অনুমতি নিয়ে যাওয়া এবং ময়লা কাপড় পরিধান করে ও ময়লাযুক্ত বোরকা পরিধান করে যাওয়া। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- “যে মেয়েলোক তার স্বামীর বাড়ি হতে স্বামীর বিনা অনুমতিতে বাইরে যায়, তাঁর ওপর ফেরেশতাগণ লানত করতে থাকেন।”

    ইসলাম ধর্মের ও মানব কল্যাণের অনেক শত্রু আছে। তারা বলে থাকে যে, পুরুষরা নারীদেরকে পরাধীন করে রেখেছে। এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভ্রান্ত। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহই স্ত্রীকে স্বামীর তাবেদারি করে চলতে নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
    الرِّ‌جالُ قَوّ‌ٰمونَ عَلَى النِّساءِ بِما فَضَّلَ اللَّهُ بَعضَهُم عَلىٰ بَعضٍ وَبِما أَنفَقوا مِن أَمو‌ٰلِهِم ۚ فَالصّـٰلِحـٰتُ قـٰنِتـٰتٌ حـٰفِظـٰتٌ لِلغَيبِ بِما حَفِظَ اللَّهُ ۚ وَالّـٰتى تَخافونَ نُشوزَهُنَّ فَعِظوهُنَّ وَاهجُر‌وهُنَّ فِى المَضاجِعِ وَاضرِ‌بوهُنَّ ۖ فَإِن أَطَعنَكُم فَلا تَبغوا عَلَيهِنَّ سَبيلًا ۗ إِنَّ اللَّهَ كانَ عَلِيًّا كَبيرً‌ا ﴿٣٤﴾
    “পুরুষরা নারীদের অভিভাবক।” [সূত্র : সূরাহ নিসা, আয়াত-৩৪]

    ইসলাম যেমন নারীদেরকে স্বামীর পূর্ণ তাবেদারি করার হুকুম করেছে, তদ্রূপ স্বামীদেরকেও নির্দেশ দিয়েছে, নিজ স্ত্রীর প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য। র্দুব্যবহার বা জুলুম করতে অতি কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তাদেরকে দ্বীনি শিক্ষা দিতে এবং যথাসম্ভব তাদের ভুল-ত্রুটিকে মাফ করতে কঠোর তাগিদ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।”
  • শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।

কতিপয় কবীরা গুনাহের বিস্তারিত বিবরণ ১৯-২৮

  • ১৯. জোর-জুলুম করে অর্থ বা অতর্কিতভাবে কোন মুসলমান বা কোন সংখ্যালঘুর ছোট কিংবা বড় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হরণ করা বা ভোগ দখল করা কবীরা গুনাহ।

    ২০. অনাথ এতিমের মাল বা নিরাশ্রয় বিধবার মাল খাওয়া কবীরা গুনাহ। এতিমও বিধবার মাল খাওয়া যেমন মহাপাপ, তদ্রূপ একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে বিধবার খেদমত করা মহাপুণ্যের কাজ।

    ২১. আল্লাহর ঘর যিয়ারতকারী তথা হজ্জ যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার করা কবীরা গুনাহ।

    ২২. মিথ্যা কসম খাওয়া কবীরা গুনাহ।

    ২৩. কোন মুসলমানকে গালি দেওয়া, মুসলমানে মুসলমানে গালাগালি করা কবীরা গুনাহ। কারণ মিথ্যা তুহমাত ও অশ্লীল কথাবার্তা প্রয়োগ-এই দু’টি পাপের দ্বারা গালি তৈরি হয়। হাদীসে আছে,“কোন মুসলমানকে যে গালি দিবে, সে ফাসিক হয়ে যাবে।”

    ২৪. জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা কবীরা গুনাহ। জিহাদের আসল অর্থ-আল্লাহর দ্বীন প্রচারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা। এমনকি যদি দ্বীনের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করে প্রাণ দিতে হয়, তাতেও কুন্ঠাবোধ না করা। দ্বীনের দুশমনরা সত্য ধর্মকে দুনিয়া থেকে মুছে ফেলার জন্য অনেক দূর থেকে অনেক সূক্ষ্ণ কূটনৈতিক চেষ্টা-তদবির করে সেগুলো উদ্ধার করে। সেসবের প্রতিকার করা জিহাদের পর্যায়ভুক্ত। আর যে জামানায় বৈধ যে উপায়ে দ্বীন জারি করা যায় এবং দ্বীনের দুশমনদেরকে দুর্বল করা যায়, সে জামানায় সেই কাজই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। সেরূপ দ্বীনের খিদমত হতেও পলায়ন করা জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করার শামিল ও সমতুল্য গুনাহর কাজ।

    ২৫. ধোঁকা দেওয়া বিশেষত শাসনকর্তা ও বিচারকর্তা কর্তৃক জনসাধারণকে ধোঁকা দেওয়া মারাত্মক কবীরা গুনাহ। কারবারের মধ্যে, বেচা-কেনার মধ্যে ধোঁকা দেয়াও মহাপাপ। কিন্তু শাসক বা বিচারক হয়ে ধোঁকা দেওয়ার তুলনা নেই।

    ২৬. অহংকার করা কবীরা গুনাহ। পদের অহমিকা বা ধন-সম্পদের গৌরবে গরিবদেরকে তুচ্ছ মনে করা বা উচ্চ বংশে জন্মগ্রহণ করায় অন্য কোন বংশীয় লোকদেরকে হেকারত বা তুচ্ছ জ্ঞান করা, যেমন যারা কাপড় বুনে, তাদেরকে জোলা বলে তুচ্ছ করা, যারা তেল উৎপাদন করে তাদেরকে তেলি বলে তুচ্ছ করা, যারা কৃষিকাজ করে, তাদেরকে চাষা বলে হেকারত করা, যারা আরবীতে ধর্মবিদ্যা চর্চা করে তাদেরকে মোল্লা বলে তুচ্ছ করা ইত্যাদি অহংকার-তাকাব্বুরও কবীরা গুনাহ বা মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত।

    ২৭. বাদ্য-বাজনাসহ নাচ-গান করা কবীরা গুনাহ। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘বর্বরতার যুগের কু-প্রথা ও কু-সংস্কারসমূহ নিশ্চিহ্ন করে ফেলার জন্য আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। যেমন-বাঁশি, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি। [সূত্র : আলকামেল ফিজ্জুআফা খন্ড-৬, পৃষ্ঠা-৪১১৮]

    ২৮. ডাকাতি করা, লুন্ঠন করা কবীরা গুনাহ। প্রত্যেক মুসলমানের এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত প্রত্যেক অমুসলমান নাগরিকের জান-মাল ও ইজ্জত পবিত্র আমানত। এ আইন ভঙ্গ করে কারো জান-মাল বা ইজ্জত হরণ করা কবীরা গুনাহ।
  • শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।