Sunday, 8 June 2014

নির্দিষ্ট মুজতাহিদ এর তাকলীদ বা অনুসরণ শির্‌ক নয় বরং ওয়াজিব

(۱) عن حذیفۃ بن الیمان ؓ قال : قال رسول اللہ ۔ ﷺ ۔ ’’انی لا أدری ما قدر بقائی فیکم فا قتدوا با لذین من بعدی ‘‘ و أشا ر إلی أبی بکرؓ و عمر ؓ .
رواہ الترمذی فی ’’جامعہ ‘‘ برقم ( ۳۶۶۲ ) کتاب المناقب ‘ باب مناقب أبی بکر ؓ و عمرؓ . و ابن ماجہ فی ’’سننہ‘‘ ۱/۸۰ (۹۷) و ہذا لفظ ابن ماجہ.
( ۲) عن عکرمۃؒ أن أہل المدینۃ سئلوا ابن عباسؓ عن إمرأۃ طافت ثم حاضت قال لہم : تنفر قالوا : لا نأخذ بقولک و ندع قول زید قال : إذا قدمتم المدینۃ فسئلوا فقدموا المدینۃ فسألوا فکان فیمن سأ لوا أم سلیم فذکرت حدیث صیفۃؓ ... الخ.
رواہ البخاری فی ’’ صحیحہ ‘‘ ۱/۴۱۷ ( ۱۷۵۸) و(۱۷۵۹) کتاب الحج ‘ باب إذا حاضت المرأۃ بعد ما أفاضت .
অর্থ: (১) হযরত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাযিঃ) বলেন: প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছন, “আমিতো জানিনা আর কতদিন তোমাদের মাঝে জীবিত থাকব, তাই আমার অবর্তমানে তোমরা এ দুজনের অনুসরণ করবে। এটা বলে তিনি হযরত আবূ বকর (রাযিঃ) ও হযরত উমরের (রাযিঃ) দিকে ইঙ্গিত করলেন। সূত্র: তিরমিযী শরীফ হাদীস নং (৩৬৬২) ইবনে মাজাহ শরীফ ১/৮০(৯৭) মুসনাদে আহমাদ ৫/৩৮২, ৩৮৫, ৩৯৯, ৪০২ (অবশিষ্ট-৪৭)
প্রকাশ থাকে যে, বর্ণিত হাদীসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ বকর (রাযিঃ) ও হযরত উমর (রাযিঃ) কে নির্দিষ্ট করে তাঁদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এবং এ ক্ষেত্রে নির্দেশ সূচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। যদ্দারা সাধারণতঃ ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। বুঝা গেল, নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করার ব্যাপারে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন এবং ওয়াজিব সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। এর মধ্যে এদিকে ও ইঙ্গিত রয়েছে যে, হযরত আবূ বকর (রাযিঃ) ও হযরত উমর (রাযিঃ) এর পরবর্তীতেও যোগ্য ব্যক্তির অনুসরণ করা যাবে। যেমন সামনের হাদীসে এর একটি নজীর রয়েছে।
অর্থ: (২) হযরত ইকরিমা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, (একদা হজ্বের মৌসুমে) মদীনাবাসীগণ হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) (মক্কার মুফতী) কে এমন এক মহিলা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন, যে তওয়াফে যিয়ারত (ফরয তাওয়াফ) করার পর ঋতুবতী হয়ে গেল। (এখন সে কি দেশে ফিরে যাবে, নাকি বিদায়ী তাওয়াফের জন্য মক্কায় অবস্থান করতে থাকবে?) তিনি জবাব দিলেন যে, সে (নিজ কাফেলার সাথে) দেশে ফিরে যাবে। মদীনাবাসীগণ বললেন: আমরা (মদীনার মুফতী) যায়েদ (রাযিঃ) এর কথা ছেড়ে আপনার কথা গ্রহণ করতে পারি না। (কারণ, হযরত যায়েদ (রাযিঃ) মদীনা শরীফে তাদের ইমাম ছিলেন এবং তার মতামত ছিল এর বিপরীত) অনন্তর, হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বললেন: তোমরা মদীনা যেয়ে জিজ্ঞেস কর, তারা তাই করলেন। মদীনা শরীফে এসে বিভিন্ন লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। প্রশ্নকারীরা যাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন তাদের মধ্যে হযরত উম্মে সুলাইম (রাযিঃ) ও ছিলেন। এবং তিনি এ প্রসংগে উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যা (রাযিঃ) এর ঘটনা বর্ণনা করেন এবং ইবনে আব্বাসের (রাযিঃ) ফত্‌ওয়ার সমর্থন করেন। সূত্র: বুখারী শরীফ ১/৪১৭ (১৭৫৮)(১৭৫৯)

প্রকাশ থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইনতিকালের পর প্রত্যেক শহরের লোকেরা ঐ শহরের বড় আলেম এর তাকলীদ করতেন এবং তাঁর ফয়সালা অনুযায়ী চলতেন। সেই হিসাবে, মদীনা বাসীগণ হযরত যায়েদ (রাযিঃ) এর তাকলীদ করতেন বলে তারা মক্কার মুফতী হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) এর ফতাওয়াকে গ্রহণ করলেন না। বরং এ ব্যাপারে তাদের ইমাম হযরত যায়েদ (রাযিঃ) এর মতামতের স্মরণাপন্ন হলেন। এর দ্বারা নিদিষ্ট ইমামের তাকলীদ প্রমাণিত হয়।
শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা

তাবলীগ জামাতের চিল্লা কি বিদআত?

প্রশ্ন

তাবলীগ জামাতওয়ালারা তাবলীগে যাওয়ার জন্য চল্লিশ দিনের চিল্লার যে দিন নির্দিষ্ট করেছে এর কোন প্রমাণ নেই। এটি একটি বিদআত। এই বিদআতকে তাবলীগওয়ালারা তাদের মাঝে প্রচলন ঘটিয়েছে।

উক্ত বক্তব্যটির সত্যতা এবং ব্যাখ্যা জানতে চাই।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

আসলে তাবলীগ জামাতে চিল্লাকে কোন শরয়ী বিধান বলা হয় না। একথাও বলা হয় না যে, এটি রাসূল সাঃ থেকে প্রমানিত কোন সুন্নত। বরং এটি দ্বীনভোলা সাধারণ মুসলমানদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত একটি কোর্স মাত্র। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্বীন বা দুনিয়াবী শিক্ষা অর্জনের জন্য ১২বছর বা ১৪বছর এমন কোর্স চালু করা হয়েছে। এমনকি মাদরাসায়ও এমন পদ্ধতি প্রচলিত। গোটা বিশ্বের দ্বীনী প্রতিষ্ঠানেই এমন সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হয়। সুনির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করা বা অবস্থান নেয়া বা প্রশিক্ষণ নেয়ার দ্বারা ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার সার্টিফিকেট দেয়া হয়।

এসব কোনটিই রাসূল সাঃ থেকে প্রমানিত বিষয় নয়। আবার বিদআতও নয়। কারণ এসব পদ্ধতিকে কেউ সুন্নতও বলে না। সেই সাথে এই সংখ্যাটিতে সওয়াব জড়িতও বলা হয় না। বরং প্রশিক্ষণের সুবিধার্তে তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যদি তাবলীগের চিল্লা পদ্ধতি বিদআত হয়, তাহলে মক্কা মদীনা ভার্সিটিসহ পৃথিবীর সকল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দ্বীনী কোর্স সম্পন্ন করার সময়সীমাও বিদআত হবে। কিন্তু কোন ব্যক্তি কি এমন আহমকী প্রশ্ন করে? যদি না করে তাহলে তাবলীগের চিল্লা নিয়ে কেন এ অহেতুক প্রশ্ন?

ইসলামী দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জনের জন্য যে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এর কোন দূরতম প্রমাণও কুরআনও হাদীসের কোথাও নেই। অথচ তাবলীগের চিল্লার খানিক হলেও প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে।

তাবলীগ জামাতের চিল্লার হিকমত

চল্লিশ দিন পর্যন্ত লাগাতার কোন আমল করলে এর দ্বারা মানুষের আত্মিক অনেক পরিবর্তন সাধিত হয় মর্মে জানা যায়। সেই সাথে এই চল্লিশ সংখ্যাটিও ইসলামী শরীয়তে আলাদা বৈষিষ্টমন্ডিত। এ কারণে কোন সাধনার জন্য এ চল্লিশ সংখ্যাটি আলাদা বৈষিষ্টে রাখে। কয়েকটি দলীল-



الَ عَبْدُ اللَّهِ: حَدَّثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ الصَّادِقُ المَصْدُوقُ، قَالَ: ” إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَبْعَثُ اللَّهُ مَلَكًا فَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ،

হযরত যায়দ বিন ওহাব রাঃ থেকে বর্ণিত। হযরত আব্দুল্লাহ রাঃ বলেন, সত্যবাদীরূপে স্বীকৃত রাসূল সাঃ আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপকরণ নিজ নিজ মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, এরপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। অনুরূপভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। এরপর তা মাংসপিন্ডে পরিণত হয়ে [আগের মত চল্লিশ দিন] থাকে। এরপর আল্লাহ তাআলা ফিরিশতা প্রেরণ করেন। আর তাকে চারটি বিষয় নির্দেশ দেয়া হয়। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩২০৮, ৩০৩৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৪৩}

উক্ত হাদীসটিতে লক্ষ্য করুন। মানুষের শারিরিক গঠনপ্রণালীর এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তিত হতে সময় নির্দিষ্ট হল ৪০দিন। অর্থাৎ এক সূরত থেকে আরেক সূরতে পরিবর্তন হয় ৪০দিনে। এভাবে তিনটি স্তর পেরোতে হয় ৪০দিন করে করে।

এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, ৪০দিনে একটি ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তন হতে পারে। যেমন জন্মলগ্নের স্তরগুলোতে পরিবর্তিত হয়েছিল।

এমনিভাবে আরেক হাদীসে এসেছে-

عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ أَسِيدٍ الْغِفَارِيِّ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَوْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” يَدْخُلُ الْمَلَكُ عَلَى النُّطْفَةِ بَعْدَمَا تَسْتَقِرُّ فِي الرَّحِمِ بِأَرْبَعِينَ لَيْلَةً – وَقَالَ سُفْيَانُ مَرَّةً: أَوْ خَمْسٍ وَأَرْبَعِينَ لَيْلَةً – فَيَقُولُ: يَا رَبِّ، مَاذَا أَشَقِيٌّ أَمْ سَعِيدٌ؟ أَذَكَرٌ أَمْ أُنْثَى؟ فَيَقُولُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى، فَيَكْتُبَانِ، فَيَقُولَانِ: مَاذَا؟ أَذَكَرٌ أَمْ أُنْثَى؟ فَيَقُولُ

মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬১৪২, মুসনাদুল হুমায়দী, হাদীস নং-৮৪৮, আলমুজামুল কাবীর, হাদীস নং-৩০৩৯}



আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আঃ থেকে ৪০দিনের ওয়াদা নিয়েছিলে। ইরশাদ হচ্ছে-

وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً

আর যখন তিনি মুসা থেকে চল্লিশ দিনের ওয়াদা নিলেন। {সূরা বাকারা-৫১}

ইমাম কুরতুবী রহঃ বলেন,

وبهذا استدل الصوفية على الوصال وان أفضله أربعون يوما الخ ((تفسيرالقرطبي ج ۱ ص ۳۹۶))

3

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ صَلَّى لِلَّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا فِي جَمَاعَةٍ يُدْرِكُ التَّكْبِيرَةَ الأُولَى كُتِبَ لَهُ بَرَاءَتَانِ: بَرَاءَةٌ مِنَ النَّارِ، وَبَرَاءَةٌ مِنَ النِّفَاقِ.

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি লাগাতার চল্লিশ দিন জামাতের সাথে তাকবীর উলার সাথে নামায পড়বে। তার জন্য দু’টি মুক্তির খোশখবরী রয়েছে। একটি হল জাহান্নাম থেকে মুক্তি আরেকটি হল মুনাফিকী থেকে মুক্তি। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৪১, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-২০২৫৩}

কাছাকাছি বক্তব্য নির্ভর আরেক হাদীসে এসেছে-

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ: «مَنْ صَلَّى فِي مَسْجِدٍ جَمَاعَةً أَرْبَعِينَ لَيْلَةً، لَا تَفُوتُهُ الرَّكْعَةُ الْأُولَى مِنْ صَلَاةِ الْعِشَاءِ، كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِهَا عِتْقًا مِنَ النَّارِ»

সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৭৯৮, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-২৬১৬।

উল্লেখিত হাদীসের আলোকে একতা স্পষ্ট যে, চল্লিশ দিনের একটি আলাদা বৈশিষ্ট আছে মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনের উপর। যেহেতু দ্বীনভোলা মানুষগুলোর মন বিগড়ে গেছে। দিনের পর দিন গোনাহ করতে করতে মন গোনাহে নাপাক হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর ইবাদতের মজা মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে উঠে যেতে বসেছে। এ কারণে এসব আত্মভোলা দ্বীনভোলা মানুষকে চল্লিশ দিনের চিল্লায় পাঠিয়ে লাগাতার চল্লিশ দিন তাকবীরে উলার সাথে নামায পড়ানোর মাধ্যমে যেন তাদের মাঝে আত্মিক পরিবর্তন আসে। তাদের মাঝে যেন মানসিক পরিবর্তন আসে, এ কারণে চল্লিশ দিনের চিল্লা দেয়া হয়। এটিকে শরয়ী কোন দলীল মনে করে করা হয় না। কেবলি হাদীসে বর্ণিত বৈশিষ্টের কারণে ওসীলা হিসেবে তা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আর নেক বিষয়ের উসীলা বৈধতার প্রমাণ স্বতসিদ্ধ।

তাবলীগের চল্লিশ দিনের চিল্লা বিদআত হলে প্রথমে বিদআত হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোর্সের দলীলহীন সময়সীমা নির্ধারণ। সেসব যদি বিদআত না হয়, তাহলে চল্লিশ দিনের আলাদা বৈশিষ্ট সম্বলিত হাদীসে পাকে দলীল থাকা সত্বেও চিল্লা কি করে বিদআত হয়?

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

মুফতী-জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়া-ঢাকা

Saturday, 7 June 2014

প্রত্যেক দূরবর্তী দেশের লোক নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে রোযা ও ঈদ পালন করবে

প্রত্যেক দূরবর্তী দেশের লোক নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে
রোযা ও ঈদ পালন করবে
 عن کریب ؒ أن أم الفضل بنت الحرث بعثتہ إلی معاویۃ ؓ بالشام قال : فقدمت الشام فقضیت حاجتہا ‘ و استہل علیّ رمضان و أنا بالشام فرأیت الہلال لیلۃ الجمعۃ ثم قدمت المدینۃ فی أخر الشہر فسألنی عبد اللہ بن عباسؓ ثم ذکر الہلال ‘ فقال : متی رأیتم الہلال ؟ فقلت :رأیناہ لیلۃ الجمعۃ فقال : أنت رأیتہ ؟ فقلت : نعم ‘ و رأہ الناس وصاموا و صام معاویۃ ؓ فقال : لکنا رأیناہ لیلۃ السبت ‘ فلا نزال نصوم حتی نکمل ثلاثین ‘ أو نراہ فقلت : أو لا تکتفی برویۃ معاویۃ و صیامہ ؟ فقال : لا ‘ ہکذا أمرنا رسول اللہ ۔ ﷺ ۔
رواہ الإمام مسلم فی’’ صحیحہ ‘‘ برقم (۱۰۸۷) کتاب الصیام ‘ باب بیان ان لکل بلد رؤیتہم و أنہم إذا رأووا الہلال ببلد لا یثبت حکمہ لما بعد عنہم.
অর্থ: হযরত কুরাইব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, যে হযরত উম্মুল ফযল বিনতে হারেজ (রাযিঃ) তাকে কোন এক প্রয়োজনে সিরিয়াতে পাঠালেন। তিনি বলেন আমি সিরিয়া পৌঁছে আমার প্রয়োজন পূর্ণ করলাম, ইত্যবসরে আমি সিরিয়াতে থাকা অবস্হাতেই রামাযানের চাঁদ উঠল। আমি দেখলাম যে, জুমু‘আর রাত্রিতে চাঁদ উঠেছে। এরপর মাসের শেষে মদীনায় ফিরে আসলে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) আমার সাথে চাঁদের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। এবং জিজ্ঞেস করলেন যে তোমরা কবে চাঁদ দেখেছো? আমি বললাম জুমু‘আর রাত্রে দেখেছি। তিনি বললেন তুমিও দেখেছ? আমি বললাম জি হ্যাঁ এবং অন্যান্য লোকেরাও দেখেছে। এবং তারা রোযা রেখেছে এবং মু‘আবিয়া (রাযিঃ) ও রোযা রেখেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন: কিন্তু আমরাতো শনিবার রাত্রে দেখেছি। কাজেই আমরা আমাদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী ত্রিশ রোযা পূর্ণ করা পর্যন্ত বা ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত রোযা রেখেই যাব। কুরাইব (রাযিঃ) বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি হযরত মু‘আবিয়া (রাযিঃ) এর চাঁদ দেখা ও রোযা রাখা কে যথেষ্ট মনে করেন না? তিনি বললেন যে, না। কারণ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ নির্দেশই দিয়েছেন। (অর্থাৎ, দূরবর্তী অন্য দেশের চাঁদ দেখাকে গ্রহণ না করে নিজেরা চাঁদ দেখে রোযা-ঈদ পালন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন)। সূত্র: মুসলিম শরীফ হাদীস নং (১০৮৭) আবূ দাউদ শরীফ হাদীস নং (২৩৩২) নাসাঈ শরীফ হাদীস নং (২১১০) তিরমিষী শরীফ হাদীস নং (৬৯৩)

উল্লেখ্য যে, এ হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, দূরবর্তী এক দেশের লোকদের চাঁদ দেখা অন্য দেশের লোকদের জন্য যথেষ্ট নয় বরং প্রত্যেক দেশের লোকজন নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে ইবাদত পালন করবে। আর এ জন্যই হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) হযরত মু‘আবিয়া (রাযিঃ) ও হযরত কুরাইবের সিরিয়াতে চাঁদ দেখে রোযা রাখাকে নিজেদের জন্য যথেষ্ট মনে করেননি। বরং তাঁর সেই দেখাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের দেখার কথা সুস্পষ্টভাবে বলে দিলেন

Tuesday, 3 June 2014

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম শেষ নবী, তাঁর পরে কাউকে নবী মানলে কাফির হয়ে যাবে

عن أبی ہریرۃ أن رسول اللہ۔ ﷺ۔ قال:ان مثلی و مثل الانبیاء من قبلی کمثل رجل بنی بیتًا فأحسنہ وأجملہ الا موضع لبنۃ من زاویہ‘ فجعل الناس یطوفون بہ ویعجبون لہ ویقولون : ہلا وضعت ہذہ اللبنۃ قال: فانا اللبنۃ واناخاتم النبیین . رواہ البخاری فی ’’صحیحہ‘‘ ۲/۸۶۸ (۳۵۳۵) کتاب المناقب‘ باب خاتم النبیین۔ﷺ۔ ومسلم فی ’’صحیحہ‘‘ برقم (۲۲۸۶)
অর্থ: হযরত আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আমার ও আমার পূর্ববর্তী নবী (আঃ) গণের দৃষ্টান্ত এরূপ, যেমন এক ব্যক্তি একটি ঘর বানিয়েছে, সেই ঘরের এক কোনে একটি মাত্র ইটের স্থান ব্যতীত বাকী সকল স্হান খুব সুন্দরভাবে সুসজ্জিত করেছে। এবার লোকেরা এসে ঘুরে ঘুরে সে ঘর দেখতে লাগল এবং আশ্চর্যান্বিত হতে লাগল এবং বলতে লাগল: ঐ ইটটি কেন দেয়া হল না? প্রিয় নরী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-আমিই সেই ইটটি। অর্থাৎ, আমি সকল নবীগণের সমাপ্তকারী। এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেল, যারা (কাদীয়ানীরা) ছায়া নবী মানে; বা যারা (বার ইমাম পন্হী শিয়া) ইমামতের নামে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে নবীর চেয়েও শক্তিশালী ব্যক্তিকে মানে তারা সকলেই কাফের এবং ইসলামের গন্ডি থেকে বহিস্কার হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে পৃথিবীর সকল হক্কানী উলামাগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন।
সূত্র: বুখারী শরীফ, ২/৮৬৮ (৩৫৩৫) মুসলিম শরীফ, হাদীস নং (২২৮৬) মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং (৭৪৯০)
এ ব্যাপারে মুফতী আজম, মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “খতমে নবুওয়াত” গ্রন্থে একশত আয়াত ও দুইশত হাদীস উল্লেখ করেছেন।

এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ওয়াজিব


عن ابن عمرؓ عن النبی ۔ﷺ۔ قال : ’’خالفواالمشرکین و وفروا اللحی واحفوا الشوارب‘‘ وکان ابن عمرؓ اذا حج او اعتمر قبض علی لحیتہ فما فضل أخذہ. رواہ البخاری فی ’’صحیحہ‘‘ ۴/۱۵۰۱ (۵۸۹۲) کتاب اللباس‘ باب تقلیم الاظفار..
অর্থ: হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইরশাদ করেছেন: তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা পূর্বক তোমাদের দাড়িকে লম্বা হতে দাও এবং মোঁচকে ছোট করে ফেল। আর হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) হজ্ব ও উমরা আদায়ান্তে স্বীয় দাড়ি মুষ্টি বদ্ধ করে অতিরিক্ত গুলো কেটে ফেলতেন। সূত্র: বুখারী শরীফ, ৪/১৫০১(৬৮৯২)
উল্লেখ্য যে, অত্র হাদীসে শুধু দাড়ি লম্বা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাতে কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয়নি। তরে হাদীসের শেষ অংশে উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) আমল দ্বারা তা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে যে, দাড়ি বাড়ানোর সর্বনিম্ন পরিমাণ হল এক মুষ্টি। আর হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) হলেন ঐ সাহাবী, যার ব্যাপারে একথা সুপ্রসিদ্ধ রয়েছে যে, হযরত সাহাবায়ে কিরামের (রাযিঃ) মধ্যে তিনিই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অধিক সাদৃশ্য অবলম্বনকারী। (দ্রষ্টব্য-সিয়ারু আলামিন নুবালা ৪/৩৫৩)

কাজেই, তিরমিযী শরীফের এক হাদীসে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাড়ি ছাটার যে কথা এসেছে, তা থেকে একথা বলা যায় যে, তিনি এক মুষ্টির অতিরিক্ত দাড়ি ছাটতেন। বলাবাহুল্য যে, চারো মাযহাবেই একমুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ওয়াজিব সাব্যস্ত করা হয়েছে।

Monday, 2 June 2014

টেলিভিশন দেখা কবীরা ণ্ডনাহ ও হারাম

টেলিভিশন দেখা কবীরা ণ্ডনাহ হারাম
عن عائشۃ ؓ زوج النبی ۔ ﷺ۔ أنہا أخبرتہ أنہا اشترت نمرقۃ فیہا تصاویر‘ فلما رأہا رسول اللہ ۔ﷺ۔ قام علی الباب‘ فلم یدخل‘ فعرفت فی وجہہ الکراہیۃ ‘ قالت : یا رسول اللہ! أتوب الی اللّٰہ والی رسولہ‘ ماذا أذنبت؟ قال : ما بال ہذہ النمرقۃ ؟ فقالت : اشتریتہا لتعقد علیہا وتوسدہا فقال رسول اللّٰہ ۔ ﷺ۔ ان أصحا ب ہذہ الصور یعذبون یوم القیامۃ‘ ویقال لہم : أحیوا ماخلقتم‘ وقال : ان البیت الذی فیہ الصور لا تدخلہا الملائکۃ. رواہ البخاری فی ’’صحیحہ‘‘ ۴/۱۵۱۳ (۵۹۶۱)کتاب اللباس‘ باب من لم یدخل بیتا فیہ صورۃ.
অর্থ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি একটি গদী কিনেছিলেন যাতে ছবি ছিল। প্রিয় নবী সাল্লালাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তা দেখলেন, তখন ঘরে প্রবেশ না করে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন হযরত আয়িশা (রাঃ) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মুবারকে অসন্তুষ্টি ভাব লক্ষ্য করলেন। ফলে আরয করলেনঃ আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের দরবারে তওবা করছি। ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি কী অপরাধ করেছি ? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়ালাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এই গদী কোথা থেকে কে এনেছে ? তিনি জবাব দিলেন: আমি ইহা কিনেছি। আপনার তাতে বসা ও হেলান দেওয়ার জন্য। এবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, এসকল ছবি নির্মাতাদের কে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেয়া হবে এবং বলা হবে যে তোমরা যা নির্মাণ করেছ তাতে জীবন দাও। এরপর বললেন: নিশ্চয় যে গৃহে কোন ছবি থাকে সে গৃহে ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।

উল্লেখ্য যে, বর্তমানে টেলিভিশনের মধ্যেও যেহেতু ছবি রয়েছে এবং টিভি এর মূখ্য উদ্দেশ্যও ছবি দেখা, তাই তা ঘরে রাখা ও দেখা এ হাদীসের ধমকির অন্তর্ভূক্ত। আর একথা অনস্বীকার্য যে, এত মারাত্মক ধমকি কোন কবীরা গোনাহের ব্যাপারেই হতে পারে।

পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করা কবীরা গুনাহ ও হারাম

পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করা কবীরা গুনাহ ও হারাম
عن عبد اللہ بن عمرؓ یقول: قال رسول اللہ ۔ﷺ۔: ’’من جر ثوبہ مخیلۃ لم ینظر اللہ الیہ یوم القیامۃ‘‘ فقلت لمحا رب : أذکر ازارہ؟ قال: ماخص ازارا ولاقمیصا. رواہ البخاری فی ’’صحیحہ‘‘ ۴/۳۸(۵۷۹۱) کتاب اللباس‘ باب من جر ثوبہ من الخیلاء. وفی روایۃ عنہ أن رسول اللہ ۔ﷺ۔ قال: بینا رجل یجر ازارہ اذخسف بہ فہو یتجلجل فی الارض الی یوم القیامۃ. رواہ البخاری فی ’’صحیحہ‘‘ ۴/۱۴۷(۵۷۹۵) کتاب اللباس‘ الباب السا بق.
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, যে ব্যক্তি অহংকার বশতঃ স্বীয় কাপড় হেঁচড়িয়ে চলবে, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার পানে (রহমতের) দৃষ্টি দিবেন না। এতদ্‌শ্রবণে বর্ণনাকারী শু‘বা (রহঃ) স্বীয় উস্তাদ হযরত মুহারেব ইবনে দিসার (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনার উস্তাদ হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) কি এ ক্ষেত্রে লুঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন? তিনি জবাব দিলেন যে, তিনি লুঙ্গি, পায়জামা, জামা কোনটাকেই নির্দিষ্ট করেননি। (অর্থাৎ যেকোন ধরণের কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পড়লেই বর্ণিত ধমকির মধ্যে পড়বে। তবে মোজা দ্বারা টাখনুর ঢাকা নিষিদ্ধ নয়) সূত্র: বুখারী শরীফ, ৪/১৪৭৮(৫৭৯১)
হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকেই অপর এক রিওয়ায়াতে আছে যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান: এক ব্যক্তি স্বীয় লুঙ্গি হেঁচড়িয়ে চলছিল, এমতাবস্থায় তাকে জমীনের মধ্যে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনভাবে যে, কিয়ামত পর্যন্ত সে জমীনে ধসতে থাকবে। সূত্র: বুখারী শরীফ, ৪/১৪৭৮ (৫৭৯০)

উল্লেখ্য যে, বর্ণিত হাদীসদ্বয়ের মধ্যে যদিও কাপড়কে ঝুলিয়ে পরার পরিমাণ বর্ণিত হয়নি, কিন্তু বুখারী শরীফের বর্ণিত হাদীসের পূর্বের হাদীসের মধ্যে সেই পরিমাণ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তাহলে টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পড়া। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কাপড়ের যে অংশটুকু টাখনুর নিচে থাকবে তা জাহান্নামে যাবে। সূত্র: বুখারী শরীফ, হাদীস নং (৫৭৮৭)
                        
  • শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী মনসূরুল হক (দা:বা:)জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মুহাম্মাদপুর-ঢাকা।

কাদিয়ানীদের প্রকৃত ইতিহাস

কাদিয়ানী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী (১৮৩৫-১৯০৮) ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাস পুরের কাদিয়ান নামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি স্ববিরোধী কিছু দাবীর মাধ্যমে নিজেকে একটি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। ইতিহাসে তার মত আরো অনেকে এভাবে বহু মতবাদ এনেছেন। শিয়া, বাহাই, ইসমাইলীয়া সম্প্রদায় সহ বিশটির অধিক মতবাদ এখনও দুনিয়াতে বিদ্যমান রয়েছে। তবে তারা কেউ কাদিয়ানীদের মত এতটুকু সমস্যা নিয়ে হাজির হয়নি। যার কারণে প্রতিটি সচেতন মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে তারা গ্রহণযোগ্য হয়নি বরং তাদের অবস্থান মুসলিম সমাজে নিত্য নতুন সমস্যা তৈরি করে চলছে।


মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে কখনও ‘নবী’ কখনও ‘মসীহ’ কখনও ‘ইমাম মাহদী’ দাবী করেছেন। এখানে মসীহ আর মাহদী এক চরিত্র নয়। মসীহ হলেন ঈসা (আঃ) এবং তিনি একজন রাসুল। ইমাম মাহদী হবেন একজন জগৎবিখ্যাত ঈমাম যিনি দুনিয়াতে আসবেন। ইসলামের ইতিহাসে ইমাম বুখারী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম গাজ্জালী সহ বহু ইমাম গত হয়েছেন। তাঁদের কাছে কখনও ওহী আসেনি এবং তারা কোন নতুন শরীয়তও ঘোষণা করেন নি। তাঁরা বরং কোরআন হাদিসের আলোকে আধুনিক সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইমাম মাহদীও সে ধরনের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি হবেন, যার কাছে নবী-রাসুলের মত ওহী আসার সম্ভাবনা নাই। মির্জা গোলাম আহমেদ আবার দাবী করেছেন তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী এসেছিল। যুক্তির খাতিরে যদি ধরা হয়, তার কাছে ওহী আসে। তাহলে তিনি আর কোন অবস্থাতেই ইমাম মাহদী হতে পারেন না। ইসলামের মৌলিক দাবী হল মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর শেষ নবী ও রাসুল, তাঁর পরে পৃথিবীতে আর কোন নবী আসবেন না। যদি কোন নবী আসতেন তাহলে হযরত ওমরকেই আল্লাহ নবী করে পাঠাতেন। সুতরাং মির্জা গোলাম আহমেদ যে নবী নয়, তা রাসুল (সাঃ) এর এই হাদিসে প্রমাণিত হয়। আবার তিনি কখনও নিজেকে মসীহ হিসেবে দাবী করেছেন। অথচ মসীহ হলেন ঈসা (আঃ) এবং তিনি একজন রাসুল ছিলেন। মসীহের মর্যাদা অর্থাৎ একজন রাসুলের মর্যাদার সাথে ইমাম মাহদী তথা একজন ইমামের মর্যাদা কিভাবে তুলনা করা যায়? যেখানে দুটোর মর্যাদাই তুলনা করা যায়না সেখানে মির্জা গোলাম আহমেদ, সেই দুটি চরিত্রই নিজের বলে দাবী করেছেন! সুতরাং তার প্রতিটি দাবী একটির সাথে অন্যটি সাংঘার্ষিক এবং সরাসরি স্ববিরোধী। অথচ পৃথিবীর কোন রাসুল এবং নবীদের কথা বার্তার একটি অক্ষরও স্ববিরোধী এবং সাংঘার্ষিক ছিলনা। এই স্ববিরোধিতার যাঁতাকলে পড়ে কাদিয়ানীরা ও দ্বিধা বিভক্ত। পাকিস্তানের কাদিয়ানীরা বলেন তিনি একজন ইমাম ছিলেন, ভারতীয় কাদিয়ানীরা বলেন তিনি একজন নবী ছিলেন, বাংলাদেশের কাদিয়ানীরা বলেন মোহাম্মাদ (সাঃ) কে তারাও নবী হিসেবে মানে। মূলত প্রতিকূল অবস্থা সামাল দিতেই কাদিয়ানীরা এই পদ্ধতির অবলম্বন করে।

নবী রাসুলদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত কয়েকটি মৌলিক দিকের কথা না বললে লেখাটির তাৎপর্য বুঝা যাবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী রাসুলদের জন্য দুনিয়ার কোন ব্যক্তিকে শিক্ষক বানায় নাই। জিবরাঈলের (আঃ) মাধ্যমে আল্লাহ নবীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। অন্যদিকে মির্জা সাহেব পুরো বাল্যকালেই বিভিন্ন মক্তব, খৃষ্টান মিশনারি থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন। আল্লাহ কোন পরাশক্তির কাছে নবীদের রিজিকের ব্যবস্থা করে নাই, আল্লাহ বিরোধী কথা বলার কারণে শিশু মুসা (আঃ) ফেরাউনের গালে প্রচণ্ড থাপ্পড় মেরেছিলেন। অথচ মির্জা গোলাম আহমেদ রিজিকের তাড়নায় ব্রিটিশের অধীনে দীর্ঘদিন কেরানীর চাকুরী করেছেন। যাদের অধীনে চাকুরী করে জীবন ধারণ করা নবী তো বহু দূরের কথা, একজন ইমামের জন্যও হারাম। সম সাময়িক খোদা-দ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে নবী রাসুলদের পাঠানো হয়েছে, আর নবীরা সেই শক্তিকে উৎখাত করে আল্লাহর বিধান কায়েম করেছে। মির্জা সাহেবের আমলে চরম খোদা-দ্রোহী শক্তি ছিল ব্রিটিশ। তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেনি বরং অনুসারীদেরকে ব্রিটিশের গোলামী করার জন্য খোদার পক্ষ থেকে ওহী জোগাড় করে এনেছেন। উপরের তিনটি ধারার কোনটিতেই মির্জা গোলাম আহমদের পরিষ্কার অবস্থান ছিলনা। তাই কোন যুক্তিতেই তাকে নবী, রাসুল কিংবা ইমাম মানার কোন সুযোগ নাই।

ব্রিটিশেরা ভারতে মুসলমানদের থেকেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। নবাব সিরাজদ্দৌলার পতনের পরও মুসলমানদের নিকট থেকে পরিপূর্ণ ক্ষমতা কেড়ে নিতে আরো একশত বছর লেগেছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব মূলত মুসলমানেরাই ঘটিয়েছিল। সেই বিপ্লবের ফলে হাজার হাজার মুসলিম আলেম শাহাদাত বরণ করেন। যার কারণে মুসলমানদের নিয়ে ব্রিটিশ তেমন স্বস্তিতে ছিলনা। ফলে এসব সমস্যা পর্যবেক্ষণ করে ব্রিটিশ সরকারকে পরামর্শ দিতে, স্যার উইলিয়াম হান্টার (১৮৪০-১৯০০খৃ) কে দিয়ে একটি কমিশন গঠন করে ভারতে পাঠানো হয়। হান্টার কমিশন ব্রিটিশ সরকারকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছিল তার মধ্যে একটি বড় অধ্যায় ছিল মুসলমানদের কে নিয়ে। তিনি তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ বইয়ে স্বীকার করেছেন, ‘যখন আমরা অস্ত্রবলে মুসলমানদের নির্মূল করতে চেয়েছি, তখন তারা আমাদের নেতাদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছে এবং আমাদের সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে’। তিনি অন্যত্র বলেছেন ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের জন্য মুসলমানেরা হল স্থায়ী বিপদ স্বরূপ’। হান্টার কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, "ভারতীয় মুসলমানরা কঠোরভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে। তাদের ধর্মগ্রন্থ কোরআনেই নির্দেশ রয়েছে বিজাতীয়দের শাসন মানা যাবে না এবং শাসকদের জুলুমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে জিহাদ করতে হবে”। কমিশন বুঝতে পারেন জিদাহী চেতনার কারণেই মুসলমানদের পর্যদুস্ত করা যায়নি এবং কোনভাবে তাদের মধ্যে বিবাদ ঢুকিয়ে দিতে পারলে তারা হীনবল হয়ে পড়বে। হান্টার কমিশন মুসলমানদের এই প্রেরণা কিভাবে নষ্ট করা যাবে সে সম্পর্কে একটি সুপারিশও পেশ করেছিলেন। তিনি সুপারিশ করেছেন, "ভারতের মুসলমানদের বিরাট সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ পীর ভক্ত। তাই মুসলমানদের মধ্য হতে আমাদের আস্থা-ভাজন এমন একজন পণ্ডিত ব্যক্তিকে দাঁড় করাতে হবে, যিনি বংশ পরম্পরায় আমাদের আস্থা-ভাজন বলে প্রমাণিত হবেন এবং মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টিতে সহযোগিতা করবেন”।

উপরের তথ্যগুলো হল ইতিহাসের পাতা থেকে তোলা। ব্রিটিশ সরকার সর্বদা এ ধরণের একজন ব্যক্তির সন্ধানে ছিলেন। অবশেষে তারা তাদের ইচ্ছে বাস্তবায়নের জন্য তাদেরই অধীনে কেরানী হিসেবে চাকুরীরত মির্জা গোলাম আহমেদকে পেয়ে যান। অর্থ কড়ির লোভ, পদের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে কিনতে পারা ব্রিটিশ পলিসির অন্যতম দিক। ইরাকের আইয়াদ আলাভী, নুরী আল মালিকি, হামিদ কারজাই, ড. ফখরুদ্দীন দের মত মানুষকে তারা পালন করেই পরবর্তীতে কাজে লাগিয়েছিল। সেভাবেই তারা মির্জা গোলাম আহমেদকে কাজে লাগানোর জন্য এক অভিনব পন্থা বের করে। ইসলাম ধর্মের মাঝে বিভেদ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দীর্ঘদিন তাকে জিইয়ে রাখার মত এমন এক পন্থা আবিষ্কার করেন যা আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়ে আছে। পৃথিবীর ইতিহাসে যত নবী-রাসুল এসেছেন তারা মানুষকে আল্লাহর পথে ডাক দিয়েছেন এবং সে অঞ্চলের মানুষের ভাষা অনুযায়ী কিতাব এনেছেন, স্থানীয় ভাষাতেই মানুষকে আল্লাহর প্রতি আহবান করেছেন। এক্ষেত্রে মির্জা গোলাম আহমেদ ভারতে জন্ম নিলেও তিনি তার দাবী অনুযায়ী ওহী এনেছেন আরবি ভাষায় অথচ তা হবার কথা ছিল হিন্দি কিংবা উর্দু ভাষায়। আরো আশ্চর্য যে, তিনি হাদিসের স্টাইলে যত বক্তব্য দিয়েছেন তা আরবি ভাষায় না হয়ে, বেশীর ভাগই উর্দু ভাষায় দিয়েছে। তার অনুসারীদের মাঝে পরবর্তী জীবনে কাউকে আর আরবি ভাষায় দক্ষ পাওয়া যায়নি। কোন নবীরা এমন কাজ করে নাই, এমনকি কোন ইমামেরা পর্যন্ত এ জাতীয় কুটিল পদ্ধতির আশ্রয় নেয় নাই। অথচ মির্জা গোলাম আহমেদ এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, ইসলাম ধর্মকে দুর্বল, আভ্যন্তরীণ গোলযোগ বাড়িয়ে দেবার প্রত্যয়ে এবং ব্রিটিশের সরকারের সহযোগিতায়।

সকল নবীরা এক আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেও তাঁদের ভাষা, শব্দ প্রয়োগ এবং পরিভাষা ছিল ভিন্ন, তবে সকল নবীদের লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন। যেমন, মুসলমানেরা যাঁদের ‘আদম-হাওয়া’ বলে খৃষ্টানেরা তাকে 'এডাম-ইভ' বলে। মুসলমানেরা যাকে জান্নাত-জাহান্নাম বলে ইহুদী-খৃষ্টানেরা সেসব বিশ্বাস করলেও অন্য নামে চিনে। মুসলমানেরা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনার্থে যাকে মসজিদ বলে, খৃষ্টানেরা তাকে গির্জা বলে, ইহুদীরা তাকে সিনাগগ বলে। ইহুদীর ধর্মগ্রন্থ ওল্ড টেস্টামেন্ট হিব্রু ভাষায় রচিত, খৃষ্টান ধর্মগ্রন্থ সুরীয়ানী ভাষায় রচিত আর পবিত্র কোরআন আরবি ভাষায় রচিত। এসব কিতাব এক আল্লাহর নিকট থেকে উৎসারিত হলেও, কোন কিতাবের পরিভাষা এক ধরনের ছিলনা। ফলে এসব ধর্মের মানুষ আলাদা বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব নিয়ে, পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে মুসলিম দেশে বাস করে আসছে। তবে মির্জা গোলাম আহমেদ এক্ষেত্রে এক নতুন ফন্দির আশ্রয় গ্রহণ করে। যেমন, তার কিতাবের কথাগুলোকে কোরআনের কথা বলা হয়। তার বর্ণিত কথাগুলোকে হাদিস বলা হয়। তাদের নির্মিত উপাসনালয়কে মসজিদ বলে, তাদের মত করে পালন করা প্রার্থনা কে নামাজ বলে। তাদের উপোষ করার পদ্ধতিকে উপবাস ব্রত, চীবর দান, ফাষ্টথিং কিংবা নতুন নামে না ডেকে বলা হয় রোজা রাখা হয়েছে! গোলাম আহমদের আনিত ধর্ম নতুন এবং তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক নাগরিক হওয়া স্বত্বেও হিন্দি ভাষার প্রাধান্যের জায়গায় আরবি ভাষাকে প্রাধান্য দিয়েছে। মুসলমানদের রেওয়াজ অনুসারে আরবি শব্দ আল্লাহকে, তিনিও আল্লাহ বলেছেন; নবীদের কে তিনিও নবী বলেছেন। সেভাবে জিবরাঈল, মিকাঈল, ইসরাফিল, নাজিল, নফল, ফরজ, আসমান, ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম, সাওম, সালাত, ইমান থেকে শুরু করে ইসলামী যত পরিভাষা আছে সকল পরিভাষা তার ধর্মের জন্যও ব্যবহার করেছেন। অথচ এসব শব্দ ও পরিভাষা আরবি এবং ইসলাম ধর্মের জন্যই ব্যবহৃত হয়। অথচ তার নতুন ধর্মের জন্য শব্দ, বাক্য, পরিভাষা অবশ্যই হিন্দি হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এসব শব্দ আরবি হওয়া সত্ত্বেও, তিনি তা হিন্দিভাষী ভারতীয়দের মাঝে ঢুকাতে চেষ্টা করেছেন। ইসলাম পরবর্তী সময়ে আরো বহু ধর্মের জন্ম হলেও, তারা আলাদা স্বতন্ত্রতা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আল্লাহ যদি ভারতীয় এলাকায় কোন নবী পাঠাতেন, তিনি হিন্দি ভাষায় কথা বলতেন, তাঁর আনিত কিতাব হিন্দি ভাষায় হত এবং ইবাদত বন্দেগীর জন্য হিন্দি ভাষায় নতুন পরিভাষা সৃষ্টি হত। গোলাম আহমদের আনিত ধর্মে সেটা কোথাও পরিলক্ষিত হয়নি বরং তিনি ইসলাম ধর্মের সকল কিছু ধারণ করে, ইসলামী অনুশাসনে অভ্যস্ত মানুষদের পথভ্রষ্ট করার নীতি গ্রহণ করেছে, এটি একটি মহা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। উল্লেখ্য আশির দশকে খৃষ্টান মিশনারিরা বাইবেল কে বঙ্গানুবাদ করতে, কোরআনের পরিভাষা গ্রহণ করেছিল। তারা ইঞ্জিল শরীফ নাম দিয়ে বাইবেল ছেপেছিল। আমি ইঞ্জিল শরীফ নামক সেই বাইবেল নিয়ে তাদের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করেছিলাম। তাদের সার্টিফিকেট সহ সেই ইঞ্জিল কিতাব এখনও আমার সংগ্রহ শালায় আছে। তবে অজানা কারণে খৃষ্টানেরা সেই পদ্ধতি নিজেরাই বাতিল করে ইংরেজি পরিভাষায় বাইবেল প্রকাশ করে। কাদিয়ানীদের কু-মতলব ছিল বলে, আরবি পরিভাষা ত্যাগ না করে, সেটাকে বিভ্রান্তির পূঁজি বানিয়েছে! সমস্যাটা এখানেই।

কাদিয়ানী ধর্মের সকল পরিভাষা যেহেতু ইসলাম থেকে নিয়েছে সেহেতু অল্প শিক্ষিত মুসলমানেরা কাদিয়ানীর কিতাব আর ইসলামী কিতাবের পার্থক্য ধরতে পারে না। কম জানা সে সকল মুসলমান আন্তরিকতার সাথে মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক হাদিসের জ্ঞান মনে মনে করে কাদিয়ানীর কিতাব পড়ে থাকে। কাদিয়ানী কিতাবের কথা বিশ্বাসের কারণে একজন অসহায় মুসলমান জানতেই পারবেনা কখন তার ঈমান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। জিহাদ সম্পর্কিত হান্টারের পরামর্শ অবিকল আমল করেছেন মির্জা গোলাম আহমেদ। তিনি মুসলমানদেরকে জিহাদের প্রেরণা থেকে দূরে রাখতে লিখনির মাধ্যমে সেই কাজ সফলতার সহিত আঞ্জাম দিয়েছেন। জিহাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত গোলাম আহমেদ নিজেই বলেছেন, ‘আমি জিহাদের বিরুদ্ধে এত লিখেছি যে, সে সব যদি জমা রাখা হত, তাহলে ৫০ টি আলমারি লাগত হেফাজতের জন্য’। কাদিয়ানীরা লোক দেখানো, দৃশ্যত আকর্ষণীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে মানুষকে দাওয়াত দেয়। যেমন, এস ভাল মুসলমান হই, আসুন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠি ইত্যাদি। এসব চটকদার সুন্দর কথায় সাধারণ মানুষ প্রভাবিত হয় এবং বিস্তারিত না জেনে তাদের সাথে ভিড়ে যায়। তাদের প্রতি উৎসাহী মানুষদের মাঝ থেকে যোগ্য ব্যক্তিকে প্রলোভনে ফেলা হয়। কাউকে বৃত্তির প্রলোভন, কাউকে বিদেশী ডিগ্রীর লোভ, উচ্চতর ডিগ্রী পাইয়ে দিতে সহযোগিতার আশ্বাস, বেশী বেতনের চাকুরীর প্রস্তাব, বিদেশী কোম্পানির বড় পদ ভাগিয়ে দেবার লোভ সহ নানাবিধ ভাবে মানুষকে ঘায়েল করা হয়। মানুষকে সাহায্যের নামে ঈমান বরবাদ করা, মুসলিম দেশে মুসলিম নাম নিয়ে বেশী সুবিধা আদায় করা, মুসলমানদের হীনবল করা, নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করা এবং মুসলমান ছপ্দনামে খৃষ্টান বিশ্বের জন্য বিশ্বস্ত গুপ্তচর বাড়ানো মূলত এই ধর্মের অন্যতম প্রধান কাজ। এই ধর্মের মূল পরিকল্পনা দাতা হল ব্রিটিশ সরকার, যার ফলে তাদের সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতার উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীতে এই ধর্মের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনকে রক্ষা ও ব্রিটিশকে আজীবন সেবা করার জন্য গোলাম আহম্মদ কাদিয়ানী তার উম্মতদের কে বহু যায়গায় প্রচুর উপদেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, “শুন, ইংরেজদের রাজত্ব তোমাদের জন্য একটি বরকত এবং খোদার তরফ হইতে তাহা তোমাদের জন্য ঢাল স্বরূপ। অতএব তোমরা নিজেদের জান প্রাণ দিয়া ঢালের যত্ন কর, হেফাজত কর, সম্মান কর। আমাদের বিরোধী মুসলমানদের তুলনায় তারা হাজার গুনে শ্রেষ্ঠ”। তবলীগে রিসালাত, ২য় খণ্ড, ১২৩ পৃষ্ঠা।

কাদিয়ানীদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে শুরু থেকই এই মতবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানেরা প্রতিবাদ করেছে। বহু বিতর্ক সভা হয়েছে সর্বত্র তারা পরাজিত হয়েছে। কয়েকবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছে। প্রত্যেক বারই ব্রিটিশ সরকার তাদের রক্ষার্থে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। ব্রিটিশ সরকার মুসলিম এবং কাদিয়ানীদের সংঘাতের মধ্যে বরাবরই কাদিয়ানীর পক্ষ নিয়েছে। পরবর্তীতে ব্রিটিশের অনুসরণে কাদিয়ানীদের কে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ সকল খৃষ্টান সম্প্রদায় তাদের পক্ষ নিতে কসুর করেনি। অন্যদিকে কাদিয়ানীদের বই-পুস্তক, বক্তৃতা-বিবৃতিতে ব্রিটিশের পক্ষে সুনাম গাওয়া থেকে প্রমাণিত হয় মূলত কাদিয়ানীরা ইসলাম ধর্মের ভিতর একটি নতুন সম্প্রদায় গড়ে তুলতে সদা সচেষ্ট। তারা ইসলাম ধর্মের ভিতরে থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে, তারা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেবে এবং পরগাছার মত ইসলাম ধর্মের ক্ষতি করার যতটুকু সম্ভব তার সবটাই করবে। পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মের নামে প্যারাসাইট বা পরগাছা হয়ে নতুন মতবাদ ঢুকানোর জন্য কাদিয়ানীর মত দ্বিতীয় ভয়ঙ্কর কোন উদাহরণ নাই। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর বেশীর ভাগ মুসলিম দেশেই কাদিয়ানীদের অমুসলিম সম্প্রদায় ঘোষণা করে এবং তাদেরকে সে সব দেশে গমন নিষিদ্ধ করা হয়। সকল ধর্মের মানুষ মুসলিম দেশে যেতে পারলেও কাদিয়ানীরা যেহেতু ইসলাম ধর্মের পরগাছা হিসেবে সৃষ্ট, তাদের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনা বেশী, তাই তাদের মুসলিম দেশে ঢুকাটা নিষেধ করা হয়েছে। এই আইনের কার্যকারিতা রহিত কল্পে ব্রিটিশ সরকার কাদিয়ানীদের জন্য তড়িৎ গতিতে প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করেছে। কাদিয়ানীরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান থেকে সৃষ্ট, আর ভারত সরকার হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং ব্রিটিশের কাছে বিশ্বস্ত। ফলে ভারত সরকার তাদের পাসপোর্ট তৈরিতে কাদিয়ানীদের ধর্মের কোন পরিচিতি উল্লেখ না করে মুসলিম হিসেবে লিখে থাকে। ফলে কাদিয়ানীরা ভারত থেকে যে কোন মুসলিম দেশে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়ে যায়। মুখে দাড়ি, নামে মুসলমান সেজে এসব ইসলাম বিনষ্টকারী ব্যক্তিরা পাসপোর্টের এই কারসাজির মাধ্যমে অতি সহজেই প্রতিটি মুসলিম দেশে ঢুকে পড়তে পারে।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান নামে মুসলমানদের জন্য নূতন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবার প্রাক্কালে কাদিয়ানীরা দুঃচিন্তা গ্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমত পাকিস্তান সৃষ্টিতে কোন ভূমিকা না রাখা, দ্বিতীয়ত নতুন মুসলিম দেশে তাদের কি পরিচিতি হবে এটাই ছিল দুঃচিন্তার কারণ। তাদের জন্য কঠিন এই বিপদের দিনে ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে আবারো হাজির হন ব্রিটিশ সরকার। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তির দর কষাকষিতে, পাকিস্তান নামক নতুন মুসলিম দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চালানোর জন্য কিছু নামধারী মুসলিম ব্যক্তিকে বাছাই করে নিয়েছিলেন, যারা নামে মুসলিম জাতে কাদিয়ানী ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্যার জাফর উল্লাহ খান (১৮৯৩-১৯৮৫)। তিনি ব্রিটিশ আমলে ভারতের প্রথম রেল মন্ত্রী ছিলেন। পাকিস্তান স্বাধীন হবার প্রাক্কালে ১৯৪৭-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের ১ম পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার কাদিয়ানীদের রক্ষা করতে কায়দা করে জাফর উল্লাহ খানকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে যান। উল্লেখ্য ব্রিটিশ রাজত্বে প্রকৃত সুন্নি মুসলমানেরা কখনও চাকুরী পেত না, এসব পদ মুসলমানদের দেবার কথা বলে, কাদিয়ানীদের বসিয়ে দেওয়া হত। তারা প্রচার করত দেখ কত বড় বড় পদ মুসলমানদের দেওয়া হয়েছে। এসব বড় কর্মকর্তাদের মুসলমান মনে করে সাধারণ মুসলিম জন সাধারণ খুবই উৎসাহ বোধ করত। ফলে ব্রিটিশ আমলেই বহু কাদিয়ানী সরকারী বড় কর্মকর্তা হবার সুযোগ পেয়ে যায়।

নতুন সৃষ্ট রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্য যখন পাসপোর্ট বানাবার দরকার পড়ে, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফর উল্লাহ খান পাসপোর্ট গুলোকে এমনভাবে তৈরি করেন যাতে কাদিয়ানীদের পরিচয় মুসলিম হিসেবে থাকে। কাউকে যাতে কাদিয়ানী হিসেবে সনাক্ত করতে না পারা যায়, সে জন্য পাসপোর্টের জন্য দরখাস্ত করতে যে সব তথ্য লাগে সেখান থেকেও তাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। কাদিয়ানীরা এই পলিসি নিরাপত্তার ভীতির জন্য করেনি! মুসলিম পরিচয়ে তারা যেন ইসলামী দেশ গুলোতে বিনা বাধায় প্রবেশ করতে পারে, সেই ধান্ধায় এটি করেছে। গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী তার নিজের ধর্মের জন্য যতটুকু করতে পেরেছে, পাকিস্তানী কাদিয়ানীদের রক্ষা করতে তার চেয়ে অনেক বেশী সার্ভিস দিয়েছে স্যার জাফর উল্লা খান। সদ্য গঠিত নূতন রাষ্ট্র পাকিস্তান কে পরিচালনা করার জন্য যোগ্য মানুষের দরকার হয়ে পড়ে, নূতন নতুন পদের জন্য নতুন ধরনের কর্মকর্তার অভাব দেখা দেয়। সে সব শূন্য পদে দলে দলে কাদিয়ানী ঢুকানোর জন্য জাফর উল্লা ও তার অন্যান্য সহকারী যারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরুতে কর্মকর্তা ছিল তারা বিরাট ভূমিকা রাখে। কাদিয়ানীদের মধ্যে যার যে ধরণের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল সেই ব্যক্তি তার মত করে প্রশাসনে ঢুকে যেতে পেরেছে। পুরো দেশের সকল শিক্ষিত কাদিয়ানীদের শহরে হাজির করা হয় এবং তাদের ধরে ধরে সরকারী চাকুরীতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু মুসলমানের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সৃষ্ট দুটি দেশের মধ্যে ভারতে হিন্দুরা আর পাকিস্তানে দৃশ্যত কাদিয়ানীরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল..